প্রফেসরের পাঠশালায় স্বাগতম

মোহাম্মদ হাফিজ পাকিস্তান ক্রিকেটের দু’টি যুগের মেলবন্ধন করেছেন। ২০০৩ সালে যখন অভিষেক হয়, দলে তখন ইউনুস খান, শোয়েব আখতার, আব্দুল রাজ্জাক, রশিদ খান কিংবা মিসবাহ উল হকরা ছিলেন। আজ ইউনুস-মিসবাহ কোচ বনে গেছেন, শোযেবকে নির্বাচক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আলোচনা চলছে, অথচ খেলোয়াড় হিসেবে টিকে আছেন হাফিজ, দিব্যি পারফরমও করে যাচ্ছেন। আজকালকার ক্রিকেট দুনিয়ায় এমন নজীর সহজে পাওয়া যায় না!

তাঁকে বলা হয় ‘প্রফেসর’ – সেটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুই অর্থেই খাটে। শক্ত চেহারা আর ড্রেসিংরুমে মুখে কখনোই কুলুপ আটতে পারেন না বলে তাঁর এই নামকরণ হয়েছে। এই কারণটা নেতিবাচক। আর ইতিবাচক ব্যাপার হল, মোহাম্মদ হাফিজ যাই বলেন – তাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনেন সতীর্থতা। তাই, ‘প্রফেসর’ নামকরণে অবশ্যই হাফিজের পড়াশোনা আর প্রজ্ঞা আর সবাইকে প্রভাবিত করাও বড় একটা কারণ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফরম্যাট মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি রান, ২০০’র বেশি উইকেট পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। ক্রিকেটের পাতায় এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা হল মাত্র ১১ জন। তাদেরই একজন হলেন পাকিস্তানের হাফিজ। স্বয়ং ইমরান খানের নামও এই তালিকায় নাই। তাই, অন্তত ইমরান খানের পর পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে হাফিজের নাম অনায়াসেই নেওয়া যায়।

মোহাম্মদ হাফিজের এই অলরাউন্ডার পরিচয়টা আরো জাকজকমের সাথে বলার সুযোগ ছিল। তবে, ব্যাপার হল অবৈধ অ্যাকশনের জন্য বারবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়েছে হাফিজের বোলিং। শুধু ব্যাটসম্যান পরিচয়ে কখনো খেলেছেন, কখনোটা টেকনিক্যাল ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ পাননি।

তাই, সেই ২০০৩ সালে অভিষেকের পরও তার আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা আহামরী নয়। তবে, বারবারই দলে জায়গা হারানোর পর তিনি সংগ্রাম করে ফিরে এসেছেন, আর বারবারই প্রমাণ করেছেন বয়স যতই হোক তিনি ফুরিয়ে যাননি। তবে, অসংখ্যবার ফিরে এসেও তিনি পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য একটা আক্ষেপের নাম।

হাফিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময় আসে ২০১১ সালে। সেই সময় এক বছরে সব ফরম্যাট মিলে মোট ১০ টি ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেন। সেবার সনাথ জয়াসুরিা ও জ্যাক ক্যালিসের পর মাত্র তৃতী অলরাউন্ডার হিসেবে এক পঞ্জিকাবর্ষে ওয়ানডেতে এক হাজার রান ও ৩০ টি উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর যে মান আর মাইলফলক ছোয়া সম্ভব ছিল, সেটা পারেননি হাফিজ।

টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ক হিসেবেও সুনাম ছিল হাফিজের। ২৯ টি ম্যাচ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন পাকিস্তানকে, তাতে পাকিস্তান জিতেছে ১৭ টিতে। হেরেছে ১১ টিতে। তিনি টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের অবিসংবাদিত সেরা অধিনায়ক। তিনি ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় যিনি এই ফরম্যাটে এক হাজার রান ও ৪০ টি উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন।

তিনি একমাত্র পাকিস্তানি অধিনায়ক যিনি টানা তিনটি টি-টোয়েন্টিতে হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছেন। সেটা ২০১২ সালের ঘটনা। এর দু’টি ছিল ভারতের বিপক্ষে, আর একটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। এক সময় হাফিজ ছিলেন ডেল স্টেইনের ‘বানি’। এক পঞ্জিকা বর্ষে প্রোটিয়া এই পেসার ১০ বার সাজঘরে ফিরিয়েছিলেন এই হাফিজকে।

টেস্টে হাফিজের সর্বোচ্চ স্কোর ২২৪। এর আগেই তিনি দু’বার ১৯০-এর ঘরে আউট হন। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোতে করেন ১৯৬। এরপর ২০১৪ সালে নিউজিজল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হন ১৯৭ রানে। হাফিজ তৃতীয় পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান হিসেবে দু’বার ১৯০-এর ঘরে আউট হন। বাকি দু’জন হলেন – ইউনুস খান ও মোহাম্মদ ইউসুফ।

মোহাম্মদ হাফিজ পাকিস্তান ক্রিকেটের দু’টি যুগের মেলবন্ধন করেছেন। ২০০৩ সালে যখন অভিষেক হয়, দলে তখন ইউনুস খান, শোয়েব আখতার, আব্দুল রাজ্জাক, রশিদ খান কিংবা মিসবাহ উল হকরা ছিলেন। আজ ইউনুস-মিসবাহ কোচ বনে গেছেন, শোযেবকে নির্বাচক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আলোচনা চলছে, অথচ খেলোয়াড় হিসেবে টিকে আছেন হাফিজ, দিব্যি পারফরমও করে যাচ্ছেন। আজকালকার ক্রিকেট দুনিয়ায় এমন নজীর সহজে পাওয়া যায় না!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...