আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি

অথচ মাননীয় সভাপতি গত কিছুদিনে গড়গড় করে যা-তা বলে যাচ্ছেন। দল থেকে তাঁকে এখন কৌশল জানায় না, একাদশ জানায় না, টসের সিদ্ধান্ত ভুল জানায়, ব্যাটিং অর্ডার ভুল বলে। তার সঙ্গে দলের কমিউনিকেশন গ্যাপ, এটাই নাকি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমস্যা! তিনি বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। সাব্বাশ! একটা দেশের ক্রিকেট মানে কি শুধু জাতীয় দল? জাতীয় দলের জোগান কোত্থেকে আসবে? একটা দেশের ক্রিকেট সিস্টেমের কোনো সিস্টেম নাই, এখানে কি কোয়ালিটি ক্রিকেটার টুপ করে আকাশ থেকে পড়বে? ক্রিকেটার পুল কি বায়ুর পরাগায়নের মাধ্যমে বাড়বে?

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের বিপর্যয় ও সাকিবের সিদ্ধান্ত, সবই দেশের ক্রিকেটের জন্য সুযোগ। নতুন কিছু নয়, তবে আরেকবার ভাবার সুযোগ দেশের ক্রিকেট নিয়ে, সিস্টেম নিয়ে, প্লেয়ার পুল নিয়ে ও এখনকার বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতা নিয়ে।

যদি আমাদের বোর্ড ও কর্তারা সেই বাস্তবতাকে মেনে নিতে চান এবং এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখতে চান।

সাকিবের ইস্যুটি ধরেই গভীরে যাওয়া যাক। তাকে ছুটি দেওয়া অবশ্যই ঠিক আছে এবং অবশ্যই তাকে বা কাউকেই জোর করে খেলানো উচিত নয়। হার্শা ভোগলের টুইট দেখলাম, তিন বছরে তিনটি সীমিত ওভারের বিশ্বকাপ মাথায় রেখে অনেক ক্রিকেটার প্রায়োরিটি ঠিক করছেন বলে মনে করছেন তিনি। ভালো কথা।

সাকিবের ভাবনায়ও এটিই থাকলে বোর্ড ও কোচিং স্টাফের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করলেই হতো। নিশ্চয়ই তখন সবাই একমত হয়েই একটা সিদ্ধান্তে আসা যেত। কিন্তু বিসিবি বারবার বলছে ‘জোর’ করে না খেলানোর কথা। কাজেই ধারণা করছি, সাকিব বিশ্বকাপ ভাবনা নিয়ে বোর্ডকে কিছু বলেননি কিংবা বললেও সব পক্ষ একমত হয়নি। তিনি নিজেই হয়তো ব্যাখ্যা করবেন কখনও।

যেটাই হোক, তাকে আটকে রাখারও কিছু নেই। আমার প্রশ্ন হলো, সাকিব না থাকলেই যে হাহাকার, তিনি না থাকলেই দলের শক্তি অর্ধেক কমে যাওয়া, ব্যালান্সড একাদশ গড়তে না পারা – দেশের ক্রিকেটের এই হাল কেন?

চলতি ভারত সফরে ইংল্যান্ড তাদের সেরা তারকাদেরও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলাচ্ছে। রোটেশন পলিসি অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ডও অনুসরণ করে। একগাদা শীর্ষ ক্রিকেটারকে ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতে এলো ভারত। সাকিব বা আরও কয়েকজনকে ছাড়া জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে হারানোর মতো দল কবে গড়তে পারবে বাংলাদেশ? কবে প্লেয়ার পুল বড় হবে? কবে দেশের ক্রিকেট কাঠামো ও সিস্টেম থেকে অনেক কোয়ালিটি ক্রিকেটার বের হবে?

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারার পর মাননীয় বিসিবি সভাপতির কথার স্রোত থামছেই না। এই কদিনেই যা যা বলেছেন, মহাকাব্য লেখা যায় তা দিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা উল্লেখ করছি। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, হেরে গিয়ে একটা দিক থেকে ভালো হয়েছে। জিতে গেলে সব ভুলে যেতাম। আর কিছু হতো না।’

শুনলে হাসিও পায়, কান্নাও পায়। গত আড়াই বছরে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের কাছে দেড়শ রানে হেরেছে বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের কাছে হেরেছে ২২৪ রানে। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হোয়াইটওয়াশড। এই সময়ে ভারতে গিয়ে দুই টেস্টে, পাকিস্তানে এক টেস্টে জঘন্যভাবে হারার কথা বাদই দিলাম। এত দিনে এসে মাননীয়র মনে হয়েছে, হেরে ভালো হয়েছে!

মাননীয় সভাপতি বলেছেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে চান। শুনে আবারও একইসঙ্গে মুখে হাসি ফোটে, চোখের জল ঝরে। সাড়ে ৮ বছর ধরে উনি দায়িত্বে আছেন, আর কবে দীর্ঘমেয়াদী কিছু শুরু হবে?

২০১২ সালের নভেম্বরে সরকারের মনোনয়নে তিনি দায়িত্ব পেয়েছিলেন। দায়িত্ব পাওয়ার পরই বলেছিলেন, ‘লঙ্গার ভার্সনে আমরা দুর্বল। এখানে মনোযোগ দিতে হবে।’ এরপর দুটি নির্বাচন উৎরে তার দায়িত্বের মেয়াদ হয়ে গেছে ৮ বছরের বেশি। টেস্টে উন্নতির জন্য কি কি পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন?

মাত্র গতবছর লাল বলের আলাদা চুক্তি হয়েছে। টেস্টের ম্যাচ ফি বেড়েছে। টেস্টের উন্নতির কাজ বলতে এটুকুই!

দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর কি অবস্থা? ঘরোয়া ক্রিকেটের কি অবস্থা? দেশের ক্রিকেট সিস্টেমের কি অবস্থা? ৮ বছরে উন্নতি কোথায় কতটা হয়েছে?

ঘরোয়া বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলা, মান বাড়ানো, ক্রিকেটারদের আগ্রহী করার মতো কোনো পথ এখনও বের করতে পারেনি বোর্ড। আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা হয়ে গেছে ফাঁকা বুলি।

ম্যাচ ফি, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো নিয়ে ক্রিকেটারদের আন্দোলন-ধর্মঘটও করতে হয়েছে। এমনকি বলের মানও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ধর্মঘটের পর সুযোগ-সুবিধা কিছু বেড়েছে। কিন্তু ভিত্তি-কাঠামো কতটুকু শত্ত হয়েছে?

বিসিবি অ্যাকাডেমির নামে যেটা আছে, তা আসলে হয়ে উঠেছে আবাসিক হোস্টেল। ক্রিকেটারদের টেকনিক্যাল সমস্যা বের করা, সেগুলো নিয়ে কাজ করার কোনো জায়গা নেই। বিভিন্ন দেশের ও কন্ডিশনের মতো উইকেট তৈরি করা তো অকল্পনীয়। স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি একাডেমির আশা করা এখানে অলীক কল্পনা।

মিরপুরের বাইরে ইনডোরগুলো টিকে আছে ধুঁকতে ধুঁকতে। মিরপুরের ইনডোরেও সমস্যার শেষ নেই।

ভালো জিমনেসিয়াম বলতে একটিই, মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে। সেখানেই জাতীয় দল, হাই পারফরম্যান্স দল, বয়সভিত্তিক দল, মেয়েদের দল, বিভিন্ন ক্লাব দল, সবার জিম করতে হয় ভাগাভাগি করে।

বিপিএল বা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের মতো টুর্নামেন্টের সময় ছোট্ট একাডেমি মাঠে একসঙ্গে ৪-৫ দলের অনুশীলন চালাতে হয়। জাতীয় দল ও এর আশেপাশে থাকা ক্রিকেটারদের ছাড়া অন্য ক্রিকেটারদের অনুশীলন সুবিধা নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। আধুনিক প্রযুক্তি তো বেশির ভাগ ক্রিকেটারের কাছে দূর আকাশের তারা।

টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুত উন্নতির জন্য সবচেয়ে জরুরি ‘এ’ দলের নিয়মিত খেলা ও সফর। কিন্তু নিয়মিত সূচি তো বহুদূর, বাংলাদেশে ‘এ’ দলের খেলাই থাকে কদাচিৎ। বিসিবির তহবিলে টাকার অভাব নেই, অথচ এই জায়গায় বিনিয়োগের মাত্রা তেমন নেই।

অথচ মাননীয় সভাপতি গত কিছুদিনে গড়গড় করে যা-তা বলে যাচ্ছেন। দল থেকে তাঁকে এখন কৌশল জানায় না, একাদশ জানায় না, টসের সিদ্ধান্ত ভুল জানায়, ব্যাটিং অর্ডার ভুল বলে। তার সঙ্গে দলের কমিউনিকেশন গ্যাপ, এটাই নাকি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমস্যা! তিনি বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। সাব্বাশ!

একটা দেশের ক্রিকেট মানে কি শুধু জাতীয় দল? জাতীয় দলের জোগান কোত্থেকে আসবে? একটা দেশের ক্রিকেট সিস্টেমের কোনো সিস্টেম নাই, এখানে কি কোয়ালিটি ক্রিকেটার টুপ করে আকাশ থেকে পড়বে? ক্রিকেটার পুল কি বায়ুর পরাগায়নের মাধ্যমে বাড়বে?

অবশ্যই জবাবদিহিতা অন্য সবারও থাকা উচিত। ব্যাটিং অর্ডার, টস, এসব পুতুপুতু কথা না বলে ক্রিকেটারদের কাছে জানতে চান কমিটমেন্ট মানে কি। জানতে চান, টেস্টের প্রতি সত্যিকার প্যাশন কার আছে, কতটা আছে। প্যাশন-কমিটমেন্ট মানে শুধু মুখের কথা নয়, নিজের উইকেট বাঁচাতে জান বাজি রাখা, একটা রান বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়া, একটা উইকেট নিতে সর্বস্ব উজার করে দেওয়া। এসব না থাকলে টেস্ট খেলার দরকার নেই। তাকে অন্য ফরম্যাটের চুক্তিতে রাখুন। যে যা খেলতে চায়, সেখানেই বিবেচনা করুন। কিন্তু যেটা করবে, সেখানে যেন কমিটমেন্ট থাকে শতভাগ।

টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচিং স্টাফ, কিউরেটর, সংশ্লিষ্ট অন্যরা – সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। কঠিন প্রশ্ন করুন। ক্রিকেটাররা লম্বা সময় বায়ো-বাবলে থাকতে চায়নি বলে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলা যায়নি, কী হাস্যকর যুক্তি! বোর্ড চাইলে ক্রিকেটাররা খেলবে না কেন? আর নিজেদের মধ্যে একটা তিন দিনের, অন্তত দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেললে কত বাড়তি সময় লাগে? কেন এক বছর পর টেস্ট খেলা হলো প্রস্তুতি ছাড়া? কেন ভারতে গোলাপি বলের টেস্ট খেলেছিল দল কোনো প্রস্তুতি ছাড়া?

সবার জবাব নিন। এবং দিন শেষে নিজেরা আয়নার সামনে দাঁড়ান। কতটুকু পেরেছেন আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে? প্রায় সাড়ে ৮ বছরে একটা দেশের ক্রিকেট সিস্টেমে খোলনলচে পাল্টে দেওয়া যেত, যদি সদিচ্ছা, পরিকল্পনা, সুদূরপ্রসারী ভাবনা আর দেশের ক্রিকেটের জন্য সত্যিকারের মমতা থাকতো।

সব গুরুত্ব যখন থাকে কেবল জাতীয় দলে, তখন জাতীয় দলও দাঁড়ায় না। এখনকার মতো এসব হম্বিতম্বি করে জোড়াতালি দিয়ে সাময়িক সাফল্য আবার হয়তো পাওয়া যাবে। টেস্ট ক্রিকেটে দেশের শীর্ণ শরীরটাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা যাবে। তবে আলতো হাওয়া এলেই সেই চাদর খসে পড়বে বারবার।

এই সময়ের বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতার কথা বলছিলাম শুরুতে। সাকিবের সঙ্গে বসুন। তার ক্যারিয়ারের বাকি বছরগুলি নিয়ে খোলামেলা পরিকল্পনা জানতে চান। দল ও টিম ম্যানেজমেন্টকে সেভাবে তৈরি করতে থাকুন। গুরুত্বপূর্ণ সব ক্রিকেটারের সঙ্গে বসুন। তাদের ভাবনা আর নিজেদের ভাবনাকে কোনো এক বিন্দুতে নেওয়ার চেষ্টা করুন। এটাই এই সময়ের বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতা। নইলে আজকে সাকিব টেস্ট রেখে আইপিএল খেলছেন, ভবিষ্যতে লিটন খেলবেন, আফিফ খেলবেন, আকবর-মৃত্যুঞ্জয়রা খেলবেন। আটকানো যাবে না।

আর, লেখার মূল বিষয়বস্তু যেটি, সাকিব বা ভবিষ্যতে আরও অনেকে না থাকলেও যেন বিকল্প থাকে, সেই সিস্টেম ডেভেলপ করুন। এই বছরই বিসিবি নির্বাচন। বাস্তবতা যা বলে, অবশ্যই আপনারাই আবার দায়িত্বে থাকবেন। বিসিবির দায়িত্বে কে, সেটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমাদের চাওয়া ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নতি। ৮ বছরে ৮ কদম এগোনো হয়নি, অন্তত এখন থেকে একটু জোর পায়ে হাঁটা শুরু হোক, নাকি?

অবশ্য আশা করিই বা কীভাবে! মাননীয় সভাপতি গতকালকেই বলেছেন, “বাংলাদেশ দলের যে খেলা দেখেছি আফগানিস্তানের সঙ্গে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই টেস্টে, এই খেলা বাংলাদেশ দলের খেলা মনে হয় না। কারণ এরাই যখন ওয়ানডে খেলছে, টি-টোয়েন্টি খেলছে, তখন পুরোপুরি আলাদা। তখন তারা ভালো খেলছে। তাহলে টেস্টে সমস্যা কোথায়?”

একটা দেশের ক্রিকেটের প্রধান ব্যক্তি যখন ওয়ানডে-টি টোয়েন্টির সঙ্গে টেস্টকে মেশান, তখন কেবল মান্না দের মতো গাইতে ইচ্ছে করে।

আমি কোন পথে যে চলি

কোন কথা যে বলি

তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই

মনের চোরাগলি

– ফেসবুক থেকে

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...