ক্রিকেট ম্যাচে স্কোরবোর্ডের রান সবকিছু বলে দেয় না, বলেও দেয়। কখনো একটা দল ২৫০ রান করেও মনে হয় ম্যাচে ছিল, আবার কখনো ৩০০ করেও মনে হয় তারা আদৌ জেতার জন্য খেলেনি। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বর্তমান বাস্তবতা যেন সেই দ্বিতীয় ধরনের—রান আছে, কিন্তু নেই জয়ের ছাপ। নেই আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের আবহ।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। তাদের ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—সবকিছুতেই ঘাটতি ছিল। তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল ‘ইন্টেন্ট’-এ, জয় করার মানসিকতায়। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেট যেখানে ৩৫০ রান তাড়া করাটাও নতুন কিছু নয়, সেখানে পাকিস্তান এখনো ২০০০ দশকের ধাঁচে ওয়ানডে খেলছে।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান খেলেছিল ৬১টি ডট বল—পুরো ১০ ওভারের সমান! এই সময়ের ক্রিকেটে যেখানে পাওয়ারপ্লেতে ৭০-৮০ রান করাও স্বাভাবিক, সেখানে পাকিস্তানের ব্যাটারদের এমন ব্যাকফুটে থাকা তাদের মাইন্ডসেটের বড় প্রতিফলন। অন্য দল যেখানে শুরু থেকেই মারতে যায়, পাকিস্তান যেন ‘পরীক্ষামূলক ব্যাটিং’ করে!

এই প্রবণতা নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ওয়ানডে ক্রিকেটে বারবার দেখিয়েছে যে তারা আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ধার ধারছে না। তাদের ইনিংস পরিকল্পনা এমন, যেন ৫০ ওভারের ম্যাচটা ৬০ ওভার হলে ভালো হতো। রান তোলার কৌশলে নেই আধুনিক ব্যাটিংয়ের বহুমুখিতা।
ক্রিকেট বদলেছে, ওয়ানডে ক্রিকেট তো আরও বেশি বদলেছে। ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-ভারতরা যে নতুন টেমপ্লেট তৈরি করেছে, পাকিস্তান সেটার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। স্লো স্ট্রাইক রেটে ইনিংস গড়া, মাঝের ওভারে একটানা ডট বল খেলা, ম্যাচের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা—সবকিছু মিলিয়ে পাকিস্তান এখনো আগের যুগের ধাঁচে আটকে আছে।
এই সময়ের ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ১০ ওভারে যত দ্রুত রান ওঠানো যায়, ততই ভালো। সেখানেই পাকিস্তানের মূল সমস্যা। তাদের ওপেনিং জুটিতে নেই কোনো আগ্রাসন, মিডল অর্ডারে নেই ম্যাচ টেম্পো বোঝার বুদ্ধিমত্তা।

একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে—২০২৩ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ভারতরা যেখানে ৩৫০ রান করাকেই স্বাভাবিক ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে, সেখানে পাকিস্তান বড় স্কোর করতে গেলেই তাদের গতি কমে যায়, পরিকল্পনা যেন এলোমেলো হয়ে পড়ে।
পাকিস্তান দলকে এই স্ট্র্যাটেজি থেকে বের হতে হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। ৩৫০ রান তাড়া করাও সম্ভব—এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে আনতে হবে। বড় দলের বিপক্ষে জয়ের জন্য আগ্রাসন দেখাতে হবে, পেসারদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাটারদের দায়িত্ব নিতে হবে।
সর্বোপরি, সময় এসেছে তাদের ওয়ানডে ক্রিকেটের ফরম্যাট বদলানোর। ২০০০ সালের ধীরস্থির ওয়ানডে পরিকল্পনায় আর কাজ হবে না, লাগবে নতুন যুগের ক্রিকেট। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ৬১ ডট বল যেন তাদের জন্য সতর্ক সংকেত হয়ে থাকে। পাকিস্তান কি সেই সংকেত বুঝতে পারবে? বদল আনতে পারবে নিজেদের খেলার ধরনে? না হলে, বিশ্ব ক্রিকেট হয়তো আরও একবার পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে।











