নাচ ময়ূরী নাচ রে

স্টিভ স্মিথ যেন ময়ুরের নাচ। ব্যাটিংয়ের ওই বেঢপ স্টান্টটা তো আর নাচের চেয়ে কম কিছু নয়। অদ্ভুত দর্শন। এলোমেলো ফুট মুভমেন্ট, হাত ঘোরান কেমন করে যেন, পাগলামি ভরা শটস — সব মিলিয়ে যেন ক্রিকেট মাঠে এক শিল্পীর উন্মাদনা। ময়ুর মত কখনও পেখম পেলেন।

স্টিভ স্মিথ যেন ময়ুরের নাচ। ব্যাটিংয়ের ওই বেঢপ স্টান্টটা তো আর নাচের চেয়ে কম কিছু নয়। অদ্ভুত দর্শন। এলোমেলো ফুট মুভমেন্ট, হাত ঘোরান কেমন করে যেন, পাগলামি ভরা শটস — সব মিলিয়ে যেন ক্রিকেট মাঠে এক শিল্পীর উন্মাদনা। ময়ুর মত কখনও পেখম পেলেন।

স্টিভেন স্মিথ তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছেন। তবে, ফ্যাব ফোর-এর দৌড়ে কেউ কেউ তাঁকে আজো প্রথমে রাখেন, ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্কেও নাম আসে তাঁর। বলা যায় না – স্টিভেন স্মিথ ফুরিয়ে গেছেন, ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে যে একটা ইনিংস খেললেন, তাতে তাঁকে ঠিক বিলীন করে দেওয়া যায় না। এভাবে আলোচনার মধ্যে থেকে রঙিন পোশাককে বিদায় বলতে সবাই পারেন না।

সময়ের স্রোত বড়ই নির্মম। ২০১৯ অ্যাশেজে যিনি একা হাতে ইংল্যান্ডকে বিধ্বস্ত করেছিলেন, ২০২০ সালে ভারতীয় বোলিং লাইনআপের বিরুদ্ধে যিনি একাই দাঁড়িয়ে ছিলেন — তাঁর ব্যাট যে কোনো ফরম্যাটে সেই আগুন ঝরায় আজো। স্টিভেন স্মিথ কি নিজেও জানেন, তাঁর সোনার তুলির মত একটা ব্যাট আছে, যে ব্যাট হাতে নিলেই রান আসে।

ওয়ানডে-টেস্টে দাপট দেখালেও টি-টোয়েন্টি যেন কখনোই তার আপন হতে পারেনি। চেষ্টা করেছেন, বারবার—কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাট স্মিথের জন্য সবসময়ই যেন ছিল এক রহস্য। তবু স্মিথ কি টি-টোয়েন্টিতে অনুচ্চারিত থেকে যাবেন? নাহ! পুনের গরম বিকেলে সুপার ওভারে স্মিথের ব্যাটে রাজস্থানের জয়, ২০১৬ বিশ্বকাপে ওয়াহাবের বলে সেই অনবদ্য ফ্লিক থেকে ছয়, কিংবা ফাইনালে পুনে সুপার জায়ান্টসের জার্সিতে তার দৃঢ়তা — এসব কী কেউ ভুলতে পারবে? টি-টোয়েন্টির স্মিথও এক কোলাজ, যার প্রতিটি ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে তার দক্ষতা, প্রতিভা, আর অদম্য মানসিকতা।

অনেকেই বলেন, স্মিথের ব্যাটিং দেখতে ভালো লাগে না। হ্যাঁ, স্মিথ ঠিক দৃষ্টিসুখকর নয়। কারণ, তিনি ঠিক ট্র্যাডিশনাল নন। মনে হয়, এই বুঝি আউট হয়ে গেলেন। কারণ, তাঁর পাগলামি, অস্থিরতা, এত নড়াচড়া করে কি আর ক্রিকেট হয়! কিন্তু, প্রখর দৃষ্টিতে তাঁকালে তাঁর মধ্যে শিল্প নয়, শিল্পীকে খুঁজে পাওয়া যাবেন, যিনি ময়ুর হয়ে নাচতে জানেন।

ক্রিকেট তো শুধু ব্যাকফুট পাঞ্চ আর কাভার ড্রাইভের খেলা নয়। ক্রিকেট এক মহাকাব্য, যেখানে স্মিথের মতো চরিত্ররা সূর্যের মতো জ্বলে ওঠে। তার ব্যাটিং এক অগ্নিঝরা সৌন্দর্য—সুপারনোভার মতো ধ্বংসাত্মক, আবার সোলার ফ্লেয়ার-এর মতো দুর্বোধ্য। প্যাটার্ন নেই, আছে খাঁটি ক্রিকেটীয় কৌশল আর ভয়ঙ্কর বুদ্ধিমত্তা। প্যাটার্ন মানলে তিনি আর ময়ুর হলেন কি করে!

ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেই পুরোনো স্মিথকেই দেখলাম। চাপে নুয়ে পড়ার বদলে যিনি ক্রিজে জমে গেলেন, বলের গতি আর লাইন বুঝে মৃদু স্পর্শেই বল ফিল্ডারের ফাঁক গলে বের করে দিলেন। যেন বুড়ো যোদ্ধা শেষ বার নেমেছেন রণক্ষেত্রে, রণক্ষেত্রে যুদ্ধের দামামা বেজেছে, ময়ুর পেখম মেলেছে, এবার আসো পারলে খেলো। অদ্ভুত পেরিফেরাল ভিশন, অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা, আর ক্রিকেটের প্রতি উন্মাদনার মিশেল না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। স্টিভেন পিটার ডেভোরিউ স্মিথ অস্তাচলের পথে হাঁটছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটটাকে ছেড়ে দিলেন তিনি। টি-টোয়েন্টিতে আর তিনি বিবেচিত নন। টেস্টও যে বেশিদিন খেলবেন তাঁর কোনো নিশ্চয়তা নাই। তখন তাকে নিয়ে আর তুলনা হবে না, ব্র্যাডম্যান প্রসঙ্গ উঠবে না, ফ্যাব ফোর বিতর্কের ঝড়ও থেমে যাবে। কিন্তু আমাদের মনের চোখে থেকে যাবে এক দৃশ্য—স্মিথের চারপাশে দশজন ফিল্ডার, আর সেই ফিল্ডারদের ফাঁক দিয়ে নিখুঁত শট প্লেস করা এক ক্রিকেট-ব্রহ্মচারী।

ক্রিকেটের আকাশে তোমার সূর্য ডোবার আগে, আরেকবার আলো ছড়িয়ে যাও! ময়ুর নাচের আসরের শেষ অধ্যায়টা মঞ্চায়িত হোক ধুমধামের সাথে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link