এশিয়া কাপ এলেই ভারত–পাকিস্তান নামটা যেন বাজে যুদ্ধের ঢাকের মতো। মিডিয়া তোলপাড়, দর্শক উত্তেজনায় ফেটে পড়ে, আর সাম্প্রতিক কালে আফগানিস্তানও সেই কোরাসে ঢুকে পড়েছে। আলো ঝলমলে হেডলাইন, তপ্ত বিশ্লেষণ—সবই যেন তাদের ঘিরেই।
কিন্তু ছায়ার ভেতরেই এক দল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ইতিহাসে ছয়বার ট্রফি তুলেছে তারা—ভারতের থেকে মাত্র দু’ধাপ পিছিয়ে। অথচ কত সবাই ভুলে যায়, এই দলটির নাম শ্রীলঙ্কা। তাদের এতটা হেলাফেলা করা হয় এশিয়ান মঞ্চে।
অন্যরা যখন বাঁশি বাজায়, তারা তখন তাঁদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র নি:শব্দে সুর মেলায়। আলো জ্বলে উঠলেই মঞ্চ কাঁপিয়ে দেওয়ার মিশন শুরু হয়। লঙ্কান সিংহরা আসলে বড় আসর আসলেই অন্য দল।

চারিথ আসালঙ্কার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কার এই দলটি অভিজ্ঞতা আর তরুণ রক্তের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ওপরে আছে তিন ভরসার নাম—পাথুম নিসাঙ্কা, কুশল মেন্ডিস আর কুশল পেরেরা।
নিসাঙ্কার স্থিরতা, মেন্ডিসের ঝলমলে আক্রমণ আর পেরেরার আগুনঝরা শুরুর মেলবন্ধনে এই টপ অর্ডার হয়ে উঠতে পারে প্রতিপক্ষ বোলারদের দুঃস্বপ্ন। তিনজনের ব্যাট একসাথে গর্জে উঠলেই মরুভূমির রাত ভেসে যাবে চামড়ার বলের ঝমঝম শব্দে।
তবে, লঙ্কান দলটার আসল ইঞ্জিন তাঁদের মিডল অর্ডার। আসালঙ্কা নিজে ঝড়ের ভেতর নোঙরের মতো দাঁড়ান, আর দাসুন শানাকা ও কামিন্দু মেন্ডিস ব্যাট ঘুরিয়ে হাতে নিয়ে আসেন ঝলকানি।

পাওয়ার হিটিং কিংবা ম্যাচ ফিনিশিংয়ে অনবদ্য তাঁরা। তাঁরা ফিরে গেলেও হাসিমুখে হাজির হন ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, তাঁরও ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে ব্যাট হাতেও।
তবে, হাসারাঙ্গার আসল ক্ষমতা বল হাতে। শ্রীলঙ্কান দলেরও তাই, দলের আসল অস্ত্র লুকিয়ে আছে ঘূর্ণিতে। আরব আমিরাতের ধীর, নিচু বাউন্সের উইকেটে স্পিনাররা সোনার দামে বিকোয়। সেখানে শ্রীলঙ্কা যেন সোনা পাহাড় করে রেখেছে।
হাসারাঙ্গা জালের মতো ঘুরিয়ে মারেন, মাহিশ থিকশানা বলকে যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধেন, আর দুনিথ ওয়েলেলাগে বাঁ-হাতি কোণ থেকে ব্যাটসম্যানের বুক কাঁপিয়ে দেন। তার ওপর মাতিশা পাথিরানার স্লিঙ্গিং অ্যাকশন — যেন হঠাৎ বজ্রপাত। প্রতিপক্ষের তালগোল পাকানো একেবারে নিশ্চিত।

আমিরাতের এই উইকেটে, এই আবহাওয়া, সব যেন কলম্বোরই একটা এক্সটেন্ডেড ভার্সন। শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানরা স্পিনকে পড়েন খোলা বইয়ের মতো, আর তাদের বোলাররা জানেন কখন কোথায় ছুরি বসাতে হয়। ফলে, শ্রীলঙ্কা যখন ছুটতে শুরু করে, তখন তারা সমুদ্রের জোয়ার—শুরুতে নীরব, শেষে অপ্রতিরোধ্য। এবারও যদি তাঁরা আলো কেড়ে নেয়, অবাক হবেন না কেউ।










