বাইশ গজে বুকের কান্না ঢাকি আমি

ক্রিকেট মানে শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়, এক অদৃশ্য আবেগের বন্ধন। কখনো সেটা চোখের জল হয়ে নামে, কখনো দায়বদ্ধতার শিকল হয়ে বাঁধে। ব্যক্তিগত শোক কিংবা অপ্রাপ্তি ডুবিয়ে দিয়ে ক্রিকেটাররা যে মাঠকে বেছে নেন, সেটা কেবল খেলার মঞ্চ নয়—জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞার জায়গা।

ক্রিকেট মানে শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়, এক অদৃশ্য আবেগের বন্ধন। কখনো সেটা চোখের জল হয়ে নামে, কখনো দায়বদ্ধতার শিকল হয়ে বাঁধে। ব্যক্তিগত শোক কিংবা অপ্রাপ্তি ডুবিয়ে দিয়ে ক্রিকেটাররা যে মাঠকে বেছে নেন, সেটা কেবল খেলার মঞ্চ নয়—জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞার জায়গা।

শ্রীলঙ্কার তরুণ স্পিনার দুনিথ ওয়েলেলাগে ঠিক তেমনই এক প্রতিশ্রুতির প্রতীক। বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে যখন চাইলেই কিছুদিন দূরে থাকতে পারেন খেলা থেকে, যখন বোর্ডও তাঁকে দিল স্বাধীনতা—চাইলে ফিরুন, চাইলে বিশ্রাম নিন। কিন্তু ২২ বছরের ওয়লেলাগে শোকের ভার বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে বেছে নিলেন দেশের ডাক।

বাবার কাছেই শিখেছিলেন—দায়িত্ব কখনো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেমন দায়িত্ব এড়াতে পারেননি খোদ শচীন রমেশ টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি কিংবা বাংলাদেশের শহিদুল ইসলাম।

পারিবারিক ত্যাগ ক্রিকেটের নতুন কোনো গল্প নয়। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাবাকে হারিয়ে চারদিনের মাথায় কেনিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামলেন শচীন টেন্ডুলকার। খেললেন ১০১ বলে ১৪০ রানের অনবদ্য ইনিংস। ম্যাচ শেষে আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যাট উঁচিয়ে দিলেন শ্রদ্ধা—যেন প্রতিটি রান বাবাকেই উৎসর্গ করা।

বিরাট কোহলির গল্পও যেন হার মানায় পর্দার গল্পকে। রঞ্জি ম্যাচে দিনের খেলা শেষে জানতে পারলেন—বাবা নেই। রাতভর শেষকৃত্য শেষে সকালে আবার ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন। রান করলেন। প্রতিটি রান যেন আকাশের ওপারে দাঁড়িয়ে বাবার চোখে নিশ্চয়ই ধরা পড়ছিল।

পেস তারকা মোহাম্মদ সিরাজ বাবার মৃত্যুসংবাদ পান অস্ট্রেলিয়ায়, বায়ো-বাবল ভাঙলে ফিরতে হতো দেশে। কিন্তু, তিনি থাকলেন। চোখের জলে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়েই বল হাতে নিলেন, ভারতের পেস বোলিং রূদ্ররূপ ধারণ করল। ঐতিহাসিক বোর্ডার গাভাস্কার সিরিজ জিতে নিল ভারত, আর সিরাজের অটোচালক বাবার অপূর্ণ স্বপ্নও পূরণ হলো মাঠে।

আফগানিস্তানের রশিদ খানও একইভাবে বাবাকে হারিয়েছিলেন বিগ ব্যাশ চলাকালে। কান্না গোপন করে খেলতে নেমেছিলেন। একই ভাবে ২০২১ এর ত্রিদেশিয় সিরিজের আগে হারিয়েছিলেন বড় ভাইকেও। শোক ভেঙে মাঠে দাঁড়িয়ে যে বার্তা দিলেন, নিজেকে উজার করে দিলেন – সেটা ক্রিকেটারদের অদম্য মানসিক শক্তিরই প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশেও আছে সেই নজির। ২০২০ সালের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টির ফাইনালের আগে বাবাকে হারান তরুণ পেসার শহিদুল ইসলাম। খুলনার টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে সময় নিতে বললেও শহিদুল নড়েননি। খেললেন।

শেষ ওভারে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামের দরকার ছিল ১৬ রান। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আস্থা রাখলেন শহিদুলের ওপর। সেই ওভারে মাত্র ১০ রান দিলেন তিনি। শিরোপা জিতল খুলনা। জিতল শহিদুল। আর সবচেয়ে বড় জয়টা ছিল তাঁর প্রয়াত বাবার জন্য।

ক্রিকেটের এই গল্পগুলো একটাই সত্য প্রমাণ করে—খেলার বাইরেও আছে এক অনন্য দায়বদ্ধতা, আছে মানুষের সঙ্গে মানুষের অদৃশ্য বন্ধন। যখন ব্যাট-বল হয়ে ওঠে শোক সামলানোর অস্ত্র, তখন ক্রিকেট আর শুধু খেলা থাকে না; হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতির নাম, হয়ে ওঠে জীবনের এক অদম্য পাঠ।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link