আলোর আগেই থাকে অন্ধকার। পরিশ্রম দিয়েই কাটতে হয় সেই অন্ধকার। তবে, গল্পটা হয় অনুপ্রেরণার। ভারতের তরুণ পেসার অর্শদীপ সিংয়ের গল্পটিও তেমনই—ঘাম, কৃতজ্ঞতা আর নিরলস পরিশ্রমে গড়া এক যাত্রাপথ।
আজ তিনি ভারতের সাদা বলের ক্রিকেটে ভরসার নাম, কিন্তু এই উচ্চতায় পৌঁছানোর আগে পাঞ্জাবের এক সাধারণ ছেলেকে পেরোতে হয়েছে প্রতিদিনের ছোট-বড় অনেক সংগ্রাম। কখনও মায়ের স্কুটারে করে কোচিংয়ে যাওয়া, কখনও ঠাসা বাসে ঝুলে যাত্রা, আর শেষ পর্যন্ত এক পুরনো সাইকেল—যা বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন।
হাসতে হাসতেই তিনি বলছিলেন, ‘আমার মা প্রতিদিন আমাকে কোচিংয়ে নিয়ে যেতেন স্কুটারে করে। স্কুল আর একাডেমি ছিল আলাদা জায়গায়। মা লাঞ্চবক্সসহ আমাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতেন, আবার প্র্যাকটিস শেষে বাড়ি ফিরিয়ে দিতেন। তখন সবকিছুই ছিল খুব সাধারণ।’

কিন্তু বড় হতে হতে সেই পথ হয়ে উঠেছিল কঠিন। বললেন, ‘বাড়ি একটু দূরে চলে যাওয়ায় বাসে যাওয়া শুরু করি। ১৫ কিলোমিটার পথ। অনেক সময় ঝুলে ঝুলে যেতাম। ভাবতাম, যদি পড়ে যাই তাহলে কী হবে! শীতে তো আরও ভয়াবহ অবস্থা—সিট পাওয়া মানেই ভাগ্য। তখনই বললাম, একটা সাইকেল চাই। অন্তত নিজের একটা সিট থাকবে!’
সেই সাইকেলই যেন ছিল তাঁর ক্রিকেট জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। আর্শদীপ বলেন, ‘বাবা বলল, সাইকেলে গেলে তোমার উরু শক্ত হবে। আর আমি তো ছোটবেলা থেকেই রোনালদোর উরুর ভক্ত!’
হাসতে হাসতে যোগ করলেন, ‘প্রতিদিন ২৮–৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালাতাম। তখন রাস্তায় গাড়ি, বাইকের সঙ্গে রেস করতাম মনে মনে—ওদের আগে পৌঁছাতে না পারলে মনে হতো, আজ উইকেট পাব না!’ এই মানসিকতাই আজও তাঁকে চালিত করে—প্রতিযোগিতা, উন্নতি, আর সেই একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি।

আর্শদীপের বাবা নিজেও একসময় ভালো ক্রিকেটার ছিলেন। এখনো কর্পোরেট ক্রিকেট খেলেন উইকেন্ডে। ছেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এক বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার। আর্শদীপ বলেন, ‘বাবা খেলতে যাওয়ার আগে নিজের পারফরম্যান্স পাঠিয়ে দেয়—চার ওভার বল করে ১৯ রান, ২ উইকেট। এবার দেখবো তুমি কী করো!’
হাসতে হাসতে আর্শদীপ বলেন, ‘আর আমি যদি ম্যাচে রান খাই, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বাবার মেসেজ—ওই ওয়াইড ইয়র্কারটা কে দেবে? আমি জানি ব্যাটসম্যান মাঝখানে অপেক্ষা করছিল! এখন তো কোচের চেয়ে বেশি উপদেশ পাই ঘরের ভেতর থেকেই।”
এই হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই অর্শদীপ ভারতের হয়ে টি–টোয়েন্টি ফরম্যাটে অন্যতম ভরসা। ইতোমধ্যেই তিনি ভারতের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে টি–টোয়েন্টিতে ১০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন—মাত্র ৬৫ ম্যাচে, ৮.৩৭ ইকোনমি রেটে। বিশ্ব ক্রিকেটেও চতুর্থ দ্রুততম বোলার তিনি, রশিদ খান, সন্দীপ লামিছানে ও ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার পরেই।

যে ছেলেটি একসময় সাইকেল চালিয়ে বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত, আজ সে ভারতের নীল জার্সিতে পেস বোলিং সামলাচ্ছেন ঠাণ্ডা মাথায়। আর্শদীপের গল্প শুধু ক্রিকেট নয়, এটা এক তরুণের স্বপ্নপূরণের কাহিনি—যেখানে পরিশ্রমই ছিল পাসপোর্ট, আর একটা পুরনো সাইকেল ছিল তাঁর প্রথম বড় মঞ্চে পৌঁছানোর ভিসা।










