ঘরের মাটির সিংহ, বিদেশে পথহারা যাত্রী

এই মুহূর্তে ইমাম উল হক যেন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে ঘরের মাঠের রাজত্ব, অন্যদিকে বিদেশের অনিশ্চয়তা। এখন দেখা যাক, এই প্রত্যাবর্তন কি নতুন এক ইমামের গল্প লেখে, নাকি পুরনো অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি হয়।

দারুণ এক প্রত্যাবর্তন! দুই দীর্ঘ বছর পর পাকিস্তানের টেস্ট দলে ফিরেছেন ইমাম উল হক, আর ফিরেই যেন নিজের পুরনো ছন্দটা খুঁজে পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ধৈর্য্যশীল এক ৯৩ রানের ইনিংস খেলে তিনি আবারও জানিয়ে দিলেন, তাঁর মধ্যে এখনও ক্লাস আছে, মনোযোগ আছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত ফর্মের ধারাবাহিকতা তিনি নিয়ে এসেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও, যা পাকিস্তানের ওপেনিং নিয়ে চলা উদ্বেগে একটুখানি স্বস্তি এনে দিয়েছে।

তবে প্রশ্নটা এখানেই—এই ইমাম কি কেবল পাকিস্তানের ঘরের মাঠেই নির্ভরযোগ্য, নাকি বিদেশের কঠিন কন্ডিশনেও নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন? কারণ পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর টেস্ট কেরিয়ারে এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে ‘হোম’ আর ‘অ্যাওয়ে’ পারফরম্যান্সে।

পাকিস্তানে খেলা ৮ টেস্টে ইমাম করেছেন ৮৮৬ রান, গড় ৬৮.১৫, সঙ্গে তিনটি শতরান। অর্থাৎ ঘরের মাঠে তিনি একদম আলাদা ব্যাটার—দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ও রানপ্রবণ। কিন্তু বিদেশে সেই চিত্র একেবারেই উল্টো।

দেশের বাইরে খেলা ১৭ টেস্টে তাঁর রান মাত্র ৭৫৪, গড় নেমে এসেছে ২৬-এ, শতরান নেই একটিও। পার্থক্যটা এতটাই তীব্র যে, বোঝা যায়—বিদেশের সুইং আর বাউন্সে ইমামের ব্যাট থমকে যায় বারবার। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পাকিস্তানের মতো কন্ডিশনেও তাঁর গড় মাত্র ২৮।

সমস্যাটা আসলে কোথায়? টেকনিক্যাল দিক থেকে ইমাম একজন দক্ষ স্পিন-খেলোয়াড়। তিনি পায়ের ব্যবহার দারুণ করেন, ধৈর্য ধরেন, বড় ইনিংস খেলতে ভালোবাসেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় পেস ও মুভমেন্টে।

সুইং করা বলে তাঁর ফ্রন্ট লেগ অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে আসে, যার ফলে ইনসুইং বল সহজেই তাঁকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে। পাশাপাশি, তিনি মাঝে মাঝে শরীর থেকে দূরের বলেও ব্যাট চালিয়ে দেন—যা বিদেশি পেসারদের জন্য উপহারস্বরূপ সুযোগ।

তবে ইতিবাচক দিকও আছে। ইমাম মানসিকভাবে শক্ত, আর রান করার ক্ষুধা তাঁর ভেতরে প্রবল। ঘরোয়া কায়েদ-ই-আজম ট্রফিতে গত মৌসুমে তিনি ৭০ গড়ে রান করেছেন, তিনটি শতরানও এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। অর্থাৎ তিনি জানেন কীভাবে বড় ইনিংস গড়তে হয়, শুধু দরকার বিদেশি পিচে নিজের টেকনিক সামান্য ঠিক করা।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই সিরিজ তাই ইমামের জন্য এক বড় সুযোগ—নিজেকে আবারও স্থায়ীভাবে প্রমাণ করার। কিন্তু আসল পরীক্ষা আসবে আগামী বছর ইংল্যান্ড সফরে। সেখানকার সুইং ও সিমে যদি তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তবে বলা যাবে পাকিস্তান পেয়েছে এক পরিণত, বহুমাত্রিক ওপেনার।

এই মুহূর্তে ইমাম উল হক যেন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে ঘরের মাঠের রাজত্ব, অন্যদিকে বিদেশের অনিশ্চয়তা। এখন দেখা যাক, এই প্রত্যাবর্তন কি নতুন এক ইমামের গল্প লেখে, নাকি পুরনো অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি হয়।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link