ধরেই নিয়েছেন আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। চেষ্টা করেও সফলতা ধরা দিচ্ছে না, প্রাপ্তির খাতা একেবারেই শূন্য, আপনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এই সময়টা আপনাকে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। টানা ৩৪ ম্যাচ পরাজয়ের ক্ষত বুকে নিয়ে, অবশেষে ৩৫ তম ম্যাচে এসে একটা জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। শুধুই কি একটা জয়? ওটা যে সাত রাজার ধন, অমূল্য রতন।
১০ জানুয়ারি, ২০০৫, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন এক দিন, যা শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, চিরদিনের জন্য লেখা হয়ে আছে আবেগ, গর্ব আর সংগ্রামের মহাকাব্যে। সাদা পোশাকে প্রথম জয় আসে বাংলাদেশের। এ এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। হারতে হারতে ক্লান্ত এক দলের মাথা তুলে দাঁড়ানোর দিন। একটি জাতির ক্রিকেট আত্মপরিচয়ের ঘোষণা।
২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বাংলাদেশের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল আলোড়ন তুলে। অভিষেক টেস্টেই ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে লড়াই করেছিল চোখে চোখ রেখে, আলো ছড়িয়ে ছিল ক্রিকেটের পাড়ায়। কিন্তু সেই আলো যতটা উজ্জ্বল ছিল, পরের পথটা ততটাই অন্ধকার। একের পর এক হার, ভাঙা স্বপ্ন, প্রশ্নবিদ্ধ আত্মবিশ্বাস। টানা ১৬টি সিরিজে পরাজয়, টেস্ট ক্রিকেট যেন বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল।
তবুও প্রত্যাশা মরেনি। সমর্থকদের বিশ্বাস মরেনি। আর সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিতেই যেন ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের মাটিতে লেখা হলো ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

৬ জানুয়ারির সকালটা যেন অন্যরকম আবহ তৈরি করেছিল। শুরু হওয়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসেই নিজেদের ভেতরের শক্তির পরিচয় দেয় বাংলাদেশ। ১১ জন লড়েছিল সমান তালে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সম্মিলিত প্রয়াসে ৪৮৮ রানের পাহাড়সমান সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। অধিনায়ক হাবিবুল বাশার খেলেন দায়িত্বশীল ৯৪ রানের ইনিংস, রাজিন সালেহ করেন ৮৯। একে একে সবাই অবদান রাখেন, এ যেন ছিল ‘টিম বাংলাদেশ’-এর প্রথম পূর্ণ প্রকাশ।
জবাবে নামা জিম্বাবুয়েকে শুরুতেই চেপে ধরে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ। মোহাম্মদ রফিকের ঘূর্ণি আর মাশরাফি বিন মর্তুজার আগুনঝরা গতিতে ৮৬ রানের মধ্যেই পাঁচ উইকেট হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে সফরকারীরা। তাতেন্দা তাইবুর আর এলটন চিগুম্বুরা কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও থামে ৩১২ রানে। রফিকের হাতে ওঠে পাঁচটি উইকেট, মাশরাফির দখলে তিনটি।
বড় লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও দলের হাল ধরেন হাবিবুল বাশার। অধিনায়কের ৫৫ রানের দৃঢ় ইনিংসে ভর করে ৯ উইকেটে ২০৪ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের সামনে তখন ৩৮১ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য, যা তাড়া করা প্রায় অসম্ভবই ছিল।
শেষ অধ্যায়ে নায়ক হয়ে ওঠেন এনামুল হক জুনিয়র। বাঁহাতি এই স্পিনারের ঘূর্ণি জাদুতে একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে। একাই ছয় উইকেট শিকার করে জিম্বাবুয়েকে গুটিয়ে দেন ১৫৪ রানে। তাপস বৈশ্য আর মাশরাফি নেন দুটি করে উইকেট। চট্টগ্রামের গ্যালারিতে তখন শুধুই উল্লাস, চোখে জল, গলায় বিজয়ের গান।

বাংলাদেশ জেতে ২২৬ রানে। টেস্ট ইতিহাসে প্রথম জয়। শুধু একটি ম্যাচ নয়, এই জয় ছিল সাহসের, ধৈর্যের আর অদম্য বিশ্বাসের প্রতীক। ওই সিরিজেই আসে প্রথম সিরিজ জয়ও, দ্বিতীয় টেস্ট ড্র করে ১-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয় ঘরের ছেলেরা।
১০ জানুয়ারি, ২০০৫ তাই শুধু একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট মহাকাব্যের সেই অধ্যায়, যেখানে পরাজয়ের অন্ধকার ছাপিয়ে প্রথমবারের মতো আলোয় দাঁড়িয়ে গর্জে উঠেছিল একটা দল, গর্জে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ।











