বিশ্বকাপের ছোঁয়া না পাওয়া সর্বকালের সেরা ফুটবল একাদশ

ফুটবল ইতিহাসে এমন বহু তারকা আছেন, যাঁদের প্রতিভা, পরিশ্রম ও প্রভাব কোনো অংশেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের থেকে কম নয়। তবুও বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁদের হাত ছুঁয়ে দেখেনি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ না পেয়েও ফুটবল ইতিহাসের পাতাজুড়ে অমর হয়ে থাকা ১১জন খেলোয়াড়দের নিয়ে থাকছে খেলা ৭১ এর তৈরি করা এই বিশেষ একাদশ।

ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো একজন খেলোয়াড়কে অমর করে তোলে। আর সেই মুহূর্তগুলোর মধ্যে বিশ্বকাপ জেতাই সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার। যেখানে জয় মানে শুধুই ট্রফি নয়, বরং ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন। লিওনেল মেসি, পেলে কিংবা দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা এই মঞ্চেই নিজেদের মহত্ত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ রেখে গেছেন।

কিন্তু ফুটবল শুধু খেললেই তো হবে না, ভাগ্যটাও লাগবে।  তাই ফুটবল ইতিহাসে এমন বহু তারকা আছেন, যাঁদের প্রতিভা, পরিশ্রম ও প্রভাব কোনো অংশেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের থেকে কম নয়। তবুও বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁদের হাত ছুঁয়ে দেখেনি।

বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ না পেয়েও ফুটবল ইতিহাসের পাতাজুড়ে অমর হয়ে থাকা ১১জন খেলোয়াড়দের নিয়ে থাকছে খেলা ৭১- এর এই বিশেষ একাদশ।

  • গোলরক্ষক: অলিভার কান

গোলপোস্টে অলিভার কান ছিলেন এক জীবন্ত আতঙ্ক। ভয়ডরহীন, আগ্রাসী ও অদম্য মানসিকতার জন্য তাঁকে ডাকা হতো ‘ডার টাইটান’। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপা জিতলেও বিশ্বকাপ অধরাই থেকে যায়।

২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে রোনালদোর জোড়া আঘাতে জার্মানির স্বপ্ন ভেঙে যায়। ৯৩ ম্যাচে ২১টি ক্লিনশিট রাখা এই গোলকিপার বিশ্বকাপ না জিতলেও জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে চিরকালই এক অদ্বিতীয় নাম।

  • রাইট ব্যাক: দানি আলভেস

ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ট্রফিজয়ী খেলোয়াড়দের একজন দানি আলভেস। ৪২টি শিরোপা জিতে তিনি কেবল লিওনেল মেসির পেছনেই অবস্থান করছেন। তবুও এই ব্রাজিলিয়ান তারকার ক্যারিয়ারে একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে – বিশ্বকাপ।

তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি ব্রাজিল। হয়তো দলগত ব্যর্থতা, হয়তো সময়ের নিষ্ঠুরতা – সব মিলিয়ে ফুটবলের অন্যতম সেরা রাইট ব্যাক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেলেন।

  • সেন্টার ব্যাক: পাওলো মালদিনি

মিলানের আকাশে পাওলো মালদিনি শুধু একটি নাম নয়, একটি ঐতিহ্য। এক ক্লাবেই ২৫ বছরের ক্যারিয়ার, ৯০০টিরও বেশি ম্যাচ, পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ – সবই তাঁর ঝুলিতে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় ইতালি। ২০০২ সালে জাতীয় দল ছাড়ার চার বছর পর ইতালি বিশ্বকাপ জিতলেও মালদিনি তখন কেবল দর্শক। তবুও ফুটবলবিশ্বে তিনি সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন।

  • সেন্টার ব্যাক: রোনাল্ড কুম্যান

খেলোয়াড় হিসেবে রোনাল্ড কুম্যান ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক ডিফেন্ডার। বল নিয়ে তাঁর সাবলীলতা তাঁকে প্রায় ডিপ লাইং প্লেমেকারে পরিণত করেছিল।

নেদারল্যান্ডসের হয়ে ৭৮ ম্যাচে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হলেও বিশ্বকাপ জয় আসেনি। ক্লাব ও দেশের হয়ে ২৪৮ গোল করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ডিফেন্ডার হয়েও বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর নাগালের বাইরে থেকেছে।

  • লেফট ব্যাক: অ্যাশলি কোল

ইংল্যান্ডের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডারদের একজন অ্যাশলি কোল। ২০০৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছালেও স্বপ্ন ভেঙে যায় টাইব্রেকারে।

১০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ৭০০টিরও বেশি ক্লাব ম্যাচ খেলা এই লেফট ব্যাক আক্রমণ ও রক্ষণ, দুই দিকেই ছিলেন সমান দক্ষ। বিশ্বকাপ না জিতলেও প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে তাঁর অবস্থান প্রশ্নাতীত।

  • সেন্ট্রাল মিডফিল্ড: ইয়োহান ক্রুইফ

ক্রুইফ কেবল একটি নাম নয়, একটি দর্শন। ফুটবলের ভাষাই বদলে দেওয়া এই ডাচ জাদুকর তিনবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ ছোঁয়া হয় নি একটিবারও।

১৯৭৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হার ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। ক্লাব ক্যারিয়ারে ৫৩৯ ম্যাচে ৪৬৮ গোল ও অ্যাসিস্ট করেও বিশ্বকাপ তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।

  • সেন্ট্রাল মিডফিল্ড: জিকো

ব্রাজিলিয়ান হয়েও বিশ্বকাপ না জেতা জিকো একেবারেই ব্যতিক্রম। জাতীয় দলের হয়ে মিডফিল্ড থেকে ৪৮ গোল করা এই ফুটবলশিল্পী ১৯৭৮ তে তৃতীয়, ১৯৮২ তে দ্বিতীয় গ্রুপ পর্ব এবং ১৯৮৬ তে কোয়ার্টার ফাইনালে থেমে যান। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার সুযোগই পাননি তিনি।

  • রাইট উইং: ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

ডান প্রান্তে রোনালদো মানেই গতি, শক্তি ও নিরলস পরিশ্রমের প্রতিচ্ছবি। ৫টি ব্যালন ডি’অর, ক্লাবে ৭২১ গোল, জাতীয় দলে ১২৫ গোলব অর্জনের পরও বিশ্বকাপ জয় তাঁর ক্যারিয়ারে নেই। ৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সময়ের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের সেই স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ।

  • লেফট উইং: গ্যারেথ বেল

ওয়েলসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা গ্যারেথ বেল। পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়, ২০১৬ ইউরো সেমিফাইনাল, ৫৬ বছর পর ওয়েলসকে বিশ্বকাপে তোলা – সবই তাঁর কীর্তি। তবে দলগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্বকাপ জয় ছিল প্রায় অসম্ভব।

  • স্ট্রাইকার: মার্কো ভ্যান বাস্তেন

গোল করাই যেন ছিল তাঁর স্বভাব। আয়াক্স ও এসি মিলানের হয়ে ৩৭৩ ম্যাচে ২৭৭ গোল, তিনটি ব্যালন ডি’অর, সবকিছু থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপটা নেই। ১৯৯০ বিশ্বকাপে একমাত্র অংশগ্রহণেও গোলশূন্য থাকেন তিনি।

  • স্ট্রাইকার: করিম বেনজেমা

রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলস্কোরার করিম বেনজেমা। ৩৩টি ট্রফি, ব্যালন ডি’অর জয়, ১৪ বছরের ক্লাব আধিপত্য – সবই তাঁর ঝুলিতে। তবে জাতীয় দলের বিতর্ক ও ২০২১ সালের মামলার কারণে বিশ্বকাপ জয় অধরাই থেকে যায়। ২০১৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতলেও বেনজেমা ছিলেন না সেই দলে, যা ফুটবল ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link