হেলমেট খুলে, দু’হাত আকাশ পানে প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন শহীদ আফ্রিদি। ক্রিকেটের হোম অব ক্রিকেট খ্যাত লর্ডসে তখন পাকিস্তানিদের আনন্দের জোয়ারে ছয়লাভ। শহীদ আফ্রিদি একাই ম্যাচ জেতাতে পারেন। সেই বিশ্বাসের স্তম্ভ পোক্ত হয়েছিল ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে। তিনি একাই যে সেদিন বিশ্বকাপের অপেক্ষা ঘুচিয়েছিলেন। পাকিস্তানকে দিয়েছিলেন এক সমুদ্র সমান স্বস্তি।
বছর দুই আগে ভারতের কাছে অল্পের জন্য শিরোপা খোয়া যায় পাকিস্তানের। মিসবাহ উল হক সেই স্কুপ শটটা সম্ভবত না খেললেই পারতেন। সেই দগদগে ক্ষত হৃদয়ে লালন করেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরে পদাপর্ণ করে পাকিস্তান। ইংল্যান্ডের বুকে, ফাইনালে আগে আর কোথাও প্রথম হতে পারেনি ইউনুস খানের পাকিস্তান।
প্রথম রাউন্ডে গ্রুপ পর্বে রানরেটের হিসেবের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল দল। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে সেই বিশ্বকাপের রানার্সআপ শ্রীলঙ্কাও ছিল তাদের সাথে একই গ্রুপে। ফাইনালে আগে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের মোলাকাত হয়েছিল বটে। সেখানে পাকিস্তানের সেই পুরনো রোগ, মুহূর্তের মধ্যে ব্যাটিং দূর্গ ধুলোয় পরিণত হয়েছিল। ১৫১ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়ে শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি জিতে নেয় ১৫ রানের ব্যবধানে।

এরপর অবশ্য ঘুরে দাঁড়ায় ইউনুস খান ও তার দল। নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে ভূপাতিত করে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে সেবার সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিল পাকিস্তান। অপর গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে ছিল ভীষণ উজ্জীবিত।
কিন্তু পাকিস্তানের সামনে খেই হারাল। ১৫০ রানের মামুল টার্গেটও টপকাতে পারেনি তারা পাকিস্তানি বোলারদের দারুণ নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে। স্রেফ সাত রানের জয় নিয়ে ফাইনালে ওঠে পাকিস্তান। শ্রীলঙ্কা ফাইনালে ওঠার পথে পরাস্ত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ৫৭ রানের বড় জয়ে হৃদয় জুড়ে তখন তাদের আত্মবিশ্বাস টইটুম্বুর।
কিন্তু বছর দুই আগে ভুল করা পাকিস্তান, এদফা ভুল আর করতে চাইল না। তার বেশ হিসেব কষা শুরু করেন বল হাতে। প্রথম দুই ওভারেই নেই শ্রীলঙ্কার দুই উইকেট। শ্রীলঙ্কাকে সেই ধাক্কা আর সামলে ওঠার সুযোগ দিল না পাকিস্তানের বোলিং ইউনিট। রানের নদী শুকিয়ে ফেলার পাশাপাশি, ক্রমাগত উইকেট শিকারের যাত্রা অব্যাহত রাখেন আবদুল রাজ্জাক, উমর গুলরা।

এর মাঝে দাঁড়িয়ে লঙ্কান সিপাহি কুমার সাঙ্গাকারা লড়ে যান একটা প্রান্ত আগলে রেখে। শেষ দিকে তার সাথে যুক্ত হন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। দুইজনের যুগলবন্দীতে ১৩৮ রান অবধি পৌঁছাতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা। বিশ্বকাপের ফাইনালে যে লক্ষ্যমাত্রা যথেষ্ট না। আবার স্নায়ুচাপ প্রতিপক্ষের উপর চাপিয়ে দিতে পারলে হয়েও যেতে পারত যথেষ্ট।
পাকিস্তানের মস্তিষ্ক জুড়ে আগের ফাইনালের বিষাদের স্মৃতি যে তখনও স্পষ্ট। ৬৩ রানের দুই উইকেট হারায় পাকিস্তান। গোটা বিশ্ব তখন অপেক্ষায় আরও এক বিপর্যয় দেখার। কিন্তু বিপর্যয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শহীদ আফ্রিদি বাজালেন আক্রমণের দামামা। ৪০ বলে ৫৪ রানের ইনিংসটি এদফা আর পাকিস্তানকে কক্ষচ্যুত হতে দেয়নি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শিরোপা দখলে নেয় পাকিস্তান। আট উইকেট আর সাত বল বাকি রাখতেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় পাকিস্তান। এদফা আর ট্র্যাজিক হিরো হতে হয়নি শহীদ আফ্রিদিকে। পাহাড়সম গ্লানি মাথায় নিয়ে তাকে ছাড়তে হয়নি মাঠ। যেমনটি ছেড়েছিলেন মিসবাহ উল হক।












