ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ইতালীয় ফুটবলের নীল বিষাদ

২০০৬ সালের সেই বার্লিন জয়ী বীরদের উল্লাসধ্বনি আজ কেবলি স্মৃতির ধুলোয় মলিন। ১৯ বছর আগের সেই সোনালী মুহূর্তের পর ইতালীয় ফুটবল যে এমন এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবে, তা কোনো কট্টর সমর্থকও কল্পনা করেননি।

ফুটবল বিধাতা যেন ইতালির জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী শোকগাথা লিখে রেখেছেন। ২০০৬ সালের সেই বার্লিন জয়ী বীরদের উল্লাসধ্বনি আজ কেবলি স্মৃতির ধুলোয় মলিন। ১৯ বছর আগের সেই সোনালী মুহূর্তের পর ইতালীয় ফুটবল যে এমন এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবে, তা কোনো কট্টর সমর্থকও কল্পনা করেননি। বসনিয়ার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ার থেকে ছিটকে পড়া এখন আর কোনো অঘটন নয়, বরং ইতালীয় ফুটবলের রুগ্ন বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিফলন।

বসনিয়ার বিরুদ্ধে এই ম্যাচটি যেন ইতালির গত কয়েক বছরের ট্র্যাজেডির এক সংক্ষিপ্ত রূপ। মোয়েস কিনের গোলে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু ৪০ মিনিটে আলেসান্দ্রো বাস্তোনির লাল কার্ড পুরো সমীকরণ বদলে দেয়। দশ জনের দল নিয়ে লড়াকু মানসিকতা দেখালেও শেষ রক্ষা হয়নি।

টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে হারার পর বিধ্বস্ত কোচ গাত্তুসোর কণ্ঠে ঝরে পড়ল কেবলই হাহাকার, ‘আমরা ব্যথিত, এই হার আমাদের প্রাপ্য ছিল না।’ কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০১৮ তে সুইডেন আর ২০২২ এ উত্তর মেসিডোনিয়ার পর ২০২৬ এর এই বিদায় এখন আজুরিদের ললাটের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৪ সালে উরুগুয়ের কাছে সেই বিতর্কিত হারের স্মৃতি আজও টাটকা, যেখানে সুয়ারেজের কামড় আর কিয়েল্লিনির ক্ষতচিহ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ইতালির বিদায়। সেই দলে বুফন, পিরলো, কিংবা দেল পিয়েরোর উত্তরসূরি হিসেবে বালোতেল্লি-ইম্মোবিলেরা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু আভিজাত্যের সেই ধার ততদিনে ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল। গড়ে ২৭.৮ বছর বয়সের সেই দলটির বিদায় ছিল আসলে এক আসন্ন ধসের পূর্বাভাস।

কেন এই পতন? ফুটবল বিশেষজ্ঞ স্টেফানো বুওনফিনোর মতে, ব্যাধিটা অনেক গভীরে। ‘ইতালির ফুটবল আজ কেবল ট্যাকটিকস বা রণকৌশলের মরণফাঁদে আটকা পড়েছে। আমাদের যুব একাডেমিগুলোতে এখন ফুটবল শেখানোর চেয়ে ফল বের করার তাগিদ বেশি। সেখানে শৈল্পিক ফুটবলের চেয়ে পেশিবহুল শরীরের জয়জয়কার।’ তাঁর ভাষ্যমতে, দেল পিয়েরা কিংবা রবার্তো ব্যাজ্জিওদের মতো জাদুকরী ফুটবলার তৈরি হওয়া এখন সুদূর পরাহত, কারণ ইতালীয় ফুটবল কাঠামো এখন ২৩ বছরের তরুণকেও অপরিণত মনে করে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখে।

নরওয়ে কিংবা বসনিয়ার মতো দলগুলোও আজ ইতালিকে টেক্কা দিচ্ছে। এই দীর্ঘ অধ:পতন কাটাতে হলে ইতালীয় ফুটবলের আমূল সংস্কার প্রয়োজন। জাতীয় দলে নয়, বরং তৃণমূল এবং সেরি আ-র ক্লাবগুলোতেও। ৪৮ দলের এই বিশাল বিশ্বকাপে আবারও ইতালির অনুপস্থিতি কেবল একটি পরাজয় না, বরং একটি গর্বিত ফুটবল জাতির অস্তিত্বের সংকট।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link