ওয়াসিম-ওয়াকার: বল হাতে যৌথ আগ্রাসনের গল্প

ক্রিকেট মাঠে বল হাতে গতির ঝড় অনেকেই তুলতে পারেন, কিন্তু ওয়াসিম-ওয়াকার তথা ‘টু ডব্লিউয়ের’ মতো সেই যূথবদ্ধ হয়ে আগ্রাসন আর বোলিং নৈপুণ্যের মেলবন্ধন দেখাতে পারেন কজন?

নব্বইয়ের দশক। পাকিস্তান দলে তখন খেলছেন এমন দুজন দীর্ঘদেহী পেসার, যাঁদের রিভার্স সুইংয়ের সামনে বিশ্বের সেরা ব্যাটিং লাইনআপগুলো তাসের ঘরের মতো তছনছ হচ্ছে। হয়ত, ক্রিকেট ইতিহাসে পেস বোলিংয়ের এমন ধ্বংসাত্মক জুটি আর কখনো কেউ দেখেননি। হ্যাঁ, বলছি ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুসের কথা।

কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের এই রাজকীয় যুগলবন্দীর? ফ্ল্যাশব্যাক করে যাক সেদিকে। ১৯৮৪ সালে ওয়াসিম আকরামের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। বাঁহাতি এই জাদুকরের কবজির মোচড়ে বল যেন পরিণত হত বিধ্বংসী গোলায়। তাঁর মারাত্মক সব রিভার্স সুইংয়ে বিভ্রান্ত হয়ে উইকেট খোয়াতেন বাঘা বাঘা ব্যাটাররা।

এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৮৯ সালে দলে আসেন ওয়াকার ইউনুস। ওয়াসিমের চেয়ে ছয় বছরের ছোট ওয়াকার বোলিংয়ে নিয়ে আসেন এক আদিম বন্য গতি। তাঁর স্লিংগি অ্যাকশনের ইন-সুইং ইয়র্কারগুলো ব্যাটারদের স্ট্যাম্পকে গুঁড়িয়ে দিত নির্মমভাবে। ওয়াসিম যখন একপ্রান্ত থেকে ব্যাটসম্যানদের ওপর নিখুঁত লাইনে চাপ বাড়াতেন, তখন অন্যপ্রান্ত থেকে ওয়াকার এসে উইকেট তুলে নিতেন ডেথ ওভারে।

এই দুই পেসারের মাঠের জাদুকরী রসায়ন শুধু চোখে ধরা দেয় না, পরিসংখ্যানও কথা বলে তাঁদের হয়ে। অবিশ্বাস্যভাবে, একসঙ্গে খেলা ৬১টি টেস্ট ম্যাচে এই জুটি শিকার করেছেন ৫৫৯টি উইকেট। আর ওয়ানডে ক্রিকেটে সেই সংখ্যাটা রেকর্ড ৭৮৭।

বিশেষ করে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে তাঁরা কতটা ভয়ংকর ছিলেন তা বোঝা যায় আরেকটা চিত্রের দিকে তাকালে। এই সময়ে খেলা ২৪টি টেস্টের ১৮টিতেই তাঁরা দুজনে মিলে প্রতিপক্ষের ১০ বা তার বেশি উইকেট তুলে নেন। পুরানো বলকে নতুন বলের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক করে তুলতে অনন্য ভূমিকা রাখেন এই দুই গতিদানব!

এই জুটির সবচেয়ে সোনালী অধ্যায় ছিল ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ। ইনজুরির কারণে আসরটি মিস করলেও দলকে বিশ্বকাপে পৌঁছাতে বড় অবদান রাখেন ওয়াকার। আর মূল মঞ্চে ওয়াসিম আকরাম হয়ে ওঠেন অতিমানবীয়। বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর সেই স্পেলটি এখনও ক্রিকেট রূপকথার অংশ হয়ে আছে। ম্যাচে যখন ইংলিশরা ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে, তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভাব তাঁর। অ্যালান ল্যাম্ব আর ক্রিস লুইসকে টানা দুই বলে আউট করে দলকে মোমেন্টাম এনে দেন তিনি! নিশ্চিত করেন পাকিস্তানের বিশ্বজয়।

ইতিহাসে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও অনন্য হয়ে আছেন ওয়াসিম-ওয়াকার! একদিনের ক্রিকেটে প্রথম বোলার হিসেবে ৫০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার গৌরবোজ্জ্বল কীর্তি গড়েন ওয়াসিম আকরাম। অন্যদিকে, ওয়াকার ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ৪০০ উইকেট নেওয়া কনিষ্ঠতম বোলার। এছাড়া, রিভার্স সুইংকে মূলধারার পেস বোলিংয়ে জনপ্রিয় করে তুলতেও এই দুই পেসারের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে!

অথচ, মাঠের এই অসাধারণ রসায়নের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক জটিল মনস্তত্ত্ব। মাঠের বাইরে কখনোই মসৃণ ছিল না তাঁদের সম্পর্ক। অধিনায়কত্ব নিয়েও এই জুটির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা আর দ্বন্দ্বের গুঞ্জন ভাসত হাওয়ায়। কিন্তু পাকিস্তানের হয়ে ম্যাচ জেতার প্রশ্নে তাঁরা সবসময়ই ছিলেন আপসহীন। মাঠে সুস্থ প্রতিযোগিতা ধরে রাখার এই প্রবণতা তাঁদের আরও সেরা করে তোলে।

একইভাবে, অবসর নেওয়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গে এই দুই কিংবদন্তির সম্পর্কের ছেদ ঘটেনি। ওয়াসিম পাকিস্তানের পরবর্তী প্রজন্মের পেস সেনসেশন শোয়েব আখতার-মোহাম্মদ আমিরদের মেন্টর হিসেবে কাজ করেন পরবর্তীতে। আর ওয়াকার পাকিস্তান জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নতুন নতুন পেস প্রতিভা গড়ে তোলেন।

ক্রিকেট মাঠে বল হাতে গতির ঝড় অনেকেই তুলতে পারেন, কিন্তু ওয়াসিম-ওয়াকার তথা ‘টু ডব্লিউয়ের’ মতো সেই যূথবদ্ধ হয়ে আগ্রাসন আর বোলিং নৈপুণ্যের মেলবন্ধন দেখাতে পারেন কজন? বাইশ গজের এই জাদুকরী জুটির স্মৃতি হয়ত চিরকাল অম্লান থাকবে ক্রিকেটপ্রেমিদের হৃদয়ে!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link