আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের বলটা যখন ওয়াংখেড়ের বাউন্ডারি লাইন পার হয়ে গ্যালারিতে আছড়ে পড়ল, ঠিক তখনই ঘাসের ওপর ধপাস করে লুটিয়ে পড়লেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তীব্র গরমে শরীরে পানির বিন্দু মাত্র নেই, ক্যুয়াড্রিসেপস আর পিঠের পেশিগুলো অবশ হয়ে আসছে। ফিজিও স্ট্র্যাচার নিয়ে মাঠে ছুটলেন, ধারাভাষ্যকারেরা ধরে নিলেন মহাকাব্যিক লড়াইয়ের এখানেই শেষ।
কিন্তু ডাক্তারদের মুখের ওপর ‘না’ বলে দিয়ে কেবল এক পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সেই পাগলপারা লোকটা। তারপর স্রেফ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, কোনো ফুটওয়ার্ক ছাড়া, ব্যাটটাকে তলোয়ারের মতো ঘুরিয়ে ১২৮ বলে ২০১ রানের যে অলৌকিক তাণ্ডব তিনি চালালেন, তা ক্রিকেট খেলাটাকে স্রেফ ব্যাটে-বলের লড়াই থেকে তুলে নিয়ে গেল রূপকথার জগতে।
এই হলেন গ্লেন জেমস ম্যাক্সওয়েল। বাইশ গজের ক্যানভাসে তিনি প্রথাগত কোনো ক্রিকেটার নন। তিনি নিয়মের শৃঙ্খল ভাঙা এমন এক খামখেয়ালি শিল্পী, যিনি চরম ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও সবচেয়ে সুন্দর সুরটি বাজাতে পারেন।

মেলবোর্নের মেঠো ক্রিকেট থেকে উঠে আসা এই অজি তারকার শৈশব থেকেই ছিল ব্যাকরণ ভাঙার সহজাত প্রবণতা। কোচদের শেখানো সোজা ব্যাটে খেলার চেয়ে বলকে গ্যালারিতে পাঠানোর নতুন পথ আবিষ্কার করতেই তিনি বেশি ভালোবাসতেন। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর ক্রিকেটদুনিয়া দ্রুতই তাঁর গায়ে সাঁটিয়ে দেয় ‘দ্য বিগ শো’ তকমা।
ম্যাক্সওয়েলের পুরো জীবনটাই যেন অদ্ভুত সব ট্র্যাজেডি আর কামব্যাকের মেলবন্ধন। ২০২২ সালে বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে এক সামান্য পিছলে পড়া দুর্ঘটনায় তাঁর পায়ের হাড় কয়েক টুকরো হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা যখন তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে দীর্ঘ সংশয় প্রকাশ করছিলেন, তখনো তিনি হাল ছাড়েননি।
কঠোর পুনর্বাসন পেরিয়ে আবার যখন মাঠে ফিরলেন, ঠিক তার পর বছর ভারতে বিশ্বকাপ চলাকালীন গলফ কার্ট থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। কিন্তু প্রতিবারই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন রূপকথার ফিনিক্স পাখির মত।

যে ভেঙে যাওয়া পা নিয়ে একসময় তাঁর স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, সেই পা-ই ২০২৩ সালের সেই ঐতিহাসিক রাতে ওয়াংখেড়েতে তৈরি করেছিল এক পায়ে দাঁড়ানো ক্রিকেট মহাকাব্য। ওডিআই রান তাড়ায় ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি দেখেছিল কোনো নরমাল ফিটনেস ছাড়া, স্রেফ আত্মশক্তির জোরে।
‘রিভার্স সুইপ’ কিংবা ‘সুইচ হিট’ এর মতো অবাধ্য শটগুলোকে যিনি ক্রিকেটের ক্যানভাসে এনে রঙ ছিটিয়েছেন, সেই ম্যাক্সওয়েল কেবল ২০১৫ ও ২০২৩ বিশ্বকাপজয়ী দলনায়কদের সঙ্গী নন। তিনি মূলত এক অবিনশ্বর ক্যালিগ্রাফি। জীবনের বিষণ্ণতম আঁধারকে যিনি ছক্কা হাঁকিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন। শরীরের পঙ্গুত্বকে যিনি মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত করতে পারেন কোনো স্বর্গীয় জাদুতে।











