আধুনিকতার ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া এক ক্লাসিক্যাল শিল্পী

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তারকাসমৃদ্ধ মুম্বাই দলে জায়গা পেয়ে যান। শুরুটা যদিও নীরব ছিল, তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই সৌরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৩১৪ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দেন—এই ছেলেটি এসেছেন টিকে থাকার জন্য, হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। সেদিন আরেক ওপেনার সুলক্ষণ কুলকার্নির সঙ্গে গড়েছিলেন ৪৫৯ রানের অবিশ্বাস্য জুটি, যা মুম্বাই ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়েছিল।

তাঁর কোনো বিধ্বংসী ইনিংস, কিংবা চোখ ধাঁধানো স্ট্রোকের ফুলঝুরি স্মরণ করতে পারবেন না। কিন্তু ব্যাট হাতে তিনি ছিলেন ক্রিকেট মাঠের এক নিঃসঙ্গ সাধু—প্রতিটি বলকে নিখুঁতভাবে ছেড়ে দেওয়া, উইকেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকা আর প্রতিপক্ষ বোলারদের হতোদ্যম করার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তিনি ওয়াসিম জাফর, নেক্সট শচীন টেন্ডুলকার হতে গিয়ে তিনি হয়েছেন সাধারণ এক ঘরোয়া কিংবদন্তি।

ভারতীয় দর্শকরা খুঁজেছেন শেবাগের আগ্রাসন, শচীনের শিল্প, বিরাটের পাগলামো—কিন্তু কেউ চাইল না ওয়াসিম জাফরের ধৈর্যের কবিতা পড়তে। অথচ তিনিও তো চেয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের মহাকাব্যে নিজের অধ্যায়টি লিখতে। মুম্বাইয়ের সেই বিখ্যাত স্কুল ক্রিকেট থেকেই নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন জাফর। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ৪০০ রানের বিশাল ইনিংস খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে। তখন থেকেই তাঁকে বলা হতে লাগল ‘নতুন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন’।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তারকাসমৃদ্ধ মুম্বাই দলে জায়গা পেয়ে যান। শুরুটা যদিও নীরব ছিল, তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই সৌরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৩১৪ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দেন—এই ছেলেটি এসেছেন টিকে থাকার জন্য, হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। সেদিন আরেক ওপেনার সুলক্ষণ কুলকার্নির সঙ্গে গড়েছিলেন ৪৫৯ রানের অবিশ্বাস্য জুটি, যা মুম্বাই ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়েছিল।

২০০০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভারতের হয়ে অভিষেক। সামনে ভয়ংকর বোলাররা—অ্যালান ডোনাল্ড, শন পোলক, জ্যাক ক্যালিস। সেই আঁধারে হারিয়ে গেলেন জাফর, চার ইনিংসে মোটে ৪৬ রান! ভারতীয় ক্রিকেটে তখন সুযোগ একবার মিস করা মানেই ব্যাকফুটে চলে যাওয়া। তাই বাদ পড়লেন দল থেকে।

তবে হার মানতে রাজি ছিলেন না তিনি। পরবর্তী তিন বছর রঞ্জি ট্রফিতে রানের বন্যা বইয়ে আবার জায়গা করে নিলেন জাতীয় দলে। ফিরে এসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করলেন, ক্যারিবিয়ান মাটিতে অ্যান্টিগায় খেললেন ২১২ রানের অনবদ্য ইনিংস। সেবারই মূলত তিনি পাকাপোক্ত করলেন নিজের জায়গা।

২০০৭ সাল যেন ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ বছর। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০২ রানের ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনিও পারেন। কিন্তু সেই পারাটা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ধীরে ধীরে ফর্ম হারালেন, হারালেন দলে জায়গাও। জাতীয় দলে ৩১ টেস্টে মাত্র ৩৪ গড়ে দুই হাজার রান, যা কখনোই একজন ওপেনারের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

অথচ, রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক! ৫৭টি সেঞ্চুরি, ৯১টি অর্ধশতক, ৫০ গড়ে ১৯ হাজারের বেশি রান—এ যেন এক অপূর্ব সমান্তরাল বাস্তবতা, যেখানে এক দুনিয়ায় তিনি রাজা, অন্য দুনিয়ায় কেবলই একজন সাধারণ সৈনিক। ৪১ বছর বয়সে এসে বিদর্ভকে রঞ্জি ট্রফির শিরোপা এনে দিলেন, যা ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর কিংবদন্তি হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট।

ওয়াসিম জাফর ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অদ্ভুত রহস্য—ঘরোয়া ক্রিকেটের রাজা, কিন্তু জাতীয় দলে এক বিস্মৃত অধ্যায়। টেকনিক্যালি নিখুঁত, ধৈর্যের মূর্তি হয়ে উইকেটে পড়ে থাকতেন তিনি, কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে সেটা কি যথেষ্ট ছিল? এই প্রজন্ম ব্যাট হাতে ঝড় দেখতে চায়, কিন্তু কেউ কি ধৈর্যের শাস্ত্র শোনার জন্য প্রস্তুত?

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link