কি অসম এক লড়াই! র্যাংকিং থেকে উচ্চতা সবখানেই তো যোজন যোজন পিছিয়ে পড়া। তবুও গৌরবের উন্নত মস্তক নিয়ে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশের মেয়েরা। ইতিহাসের প্রথমবার তারা পা রেখেছে এশিয়ান কাপের মঞ্চে। স্রেফ এতটুকুই তো যথেষ্ট। তবে না, নিন্দুকের ধ্বংসাত্মক চোখেও মেয়েরা সম্মান দেখতে চাইল। তারা রীতিমত জীবন দিয়ে লড়াই করল।
চাট্টিখানি কথা নয়। এশিয়ার সেরা ১২টি দলের একটি হওয়ার জন্য তো কম কাঠখড় পোড়াতে হয় নাই। গ্রামের ধুলোমাখা ময়দানেও যাদের খেলতে মানা- সেই মেয়েরাই অস্ট্রেলিয়ার বুকে বাংলাদেশের পতাকার মর্যাদা বাড়াতে সংগ্রাম করলেন পুরো নব্বইটা মিনিট। চোখ বন্ধ করে চীনকে বলা যায় পরাশক্তি।
এশিয়ান কাপের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। নারী ফুটবলের র্যাংকিংয়ে ১৭ নম্বরে তাদের অবস্থান। মোট নয়বার এই দলটা জিতেছে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। এই দলের গড় উচ্চতা ৫ ফিট ৭ ইঞ্চি, বাংলাদেশের গড়টা ৪ ফিট ৮ ইঞ্চি। র্যাংকিংয়ে ১১২ তম অবস্থানের নতুন কুড়ি বাংলাদেশ।

কণ্ঠকাকীর্ণ একটা পথ পাড়ি দিয়ে তারা এশিয়ার সর্বোচ্চ মঞ্চের টিকিট কেটেছিল। আফঈদা খন্দকার ও তার বয়সীয় তরুণিদের জন্য এত বড় মঞ্চ এতদিন স্রেফ এক দিবাস্বপ্ন। ঝিরিপথের পাশে দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণার কোন এক বান্ধুবি নিশ্চয়ই আজ গর্ব করছে তাকে নিয়ে। আফঈদা খন্দকারদের বাসায় হয়ত কেউ বলেই বসল, ‘লোকের কথা শুনলে কি এমন দিন দেখা হতো!’
এই মেয়েদের অর্জনকে একটা পরাজয় দিয়ে পরিমাপ করবার উপায় নেই। এরাই পথপ্রদর্শক। কত প্রতিকূলতা ডিঙিয়েছেন শামসুন্নাহাররা তার ফিরিস্তি করতে গেলে প্রতিটা পরতে পরতে মনে হবে- ‘এই মেয়ে গুলো হয়েছে প্রতারিত’। লাল-সবুজের মায়ায় ফুটবলকে আগলে ধরা মেয়েগুলোকে হেনস্তা হতে হয়েছে, অর্থের অভাব সইতে হয়েছে, পুষ্টির অভাব- তা তো চিরকালের।
এশিয়ান কাপ খেলতে গিয়েও নিস্তার হয়নি। একটা অনুশীলন ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। দলের সাথে কোন ফিজিও পাঠানো হয়নি। সংবাদ প্রচারের পর অস্ট্রেলিয়ান এক প্রবাসীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, দায়সাড়া কর্মকাণ্ডের আরও এক ফিরিস্তি। এত কিছুর পরও পিটার বাটলারের মেয়েরা লড়ে গেছে।

বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলটার বিরুদ্ধে স্রেফ দুইটি গোল হজম করেছে। ৯০ মিনিটের ৮০ মিনিটেই তারা রুখে দিয়েছেন চীনকে। প্রথমার্ধের ওই দশটা মিনিটকে কোনভাবে মুছে দেওয়া গেলে অর্জনের মাত্রা চীনের প্রাচীর ভেদ করার সমতুল্য হয়ে যেতে পারত অনায়াসে।
তবুও আক্ষেপের সুযোগ নেই। প্রতারিত হওয়ার এই মেয়েগুলোর দেশের প্রতি, ফুটবলের প্রতি যে প্রেম, যে ভালবাসা, যে নিবেদন- তা খর্ব করে দেখার কোন উপায় নেই। গর্বের পথচলায় ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল এক অধ্যায় হয়ে রইবে নারী এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি।











