পাকিস্তান পেয়েছিল ভারতীয়দের সম্মান

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই এখন সবার চোখে রাজনীতি, উত্তেজনা, গ্যালারির আগ্রাসন আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে খেলাধুলা রাজনীতি আর আবেগের সীমানা পেরিয়ে মানবিকতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। ১৯৯৯ সালের চেন্নাই টেস্ট এমনই এক স্মরণীয় অধ্যায়।

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই এখন সবার চোখে রাজনীতি, উত্তেজনা, গ্যালারির আগ্রাসন আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে খেলাধুলা রাজনীতি আর আবেগের সীমানা পেরিয়ে মানবিকতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। ১৯৯৯ সালের চেন্নাই টেস্ট এমনই এক স্মরণীয় অধ্যায়।

নয় বছর বিরতির পর ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলতে আসে পাকিস্তান। কিন্তু সিরিজ শুরুর আগেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। ম্যাচের আগেই দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামের পিচ উগ্রপন্থীরা নষ্ট করে দেয়। ফলে নির্ধারিত সূচি বদলাতে হয়। দ্বিতীয় টেস্টের ভেন্যু চেন্নাইয়ের এম এ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামেই আয়োজন করা হয় সিরিজের প্রথম ম্যাচ।

পরিস্থিতি কতটা স্পর্শকাতর ছিল, তা বোঝা যায় স্টেডিয়ামে প্রায় তিন হাজার পুলিশ ও সামরিক সদস্য মোতায়েনের মধ্য দিয়ে। এই চাপা উত্তেজনার মাঝেই ১৯৯৯ সালের ২৮ জানুয়ারি শুরু হয় ম্যাচটি।

টসে জিতে পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতেই কুম্বলে ও শ্রীনাথের দারুণ বোলিংয়ে ৯১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান। দ্রুত বিদায় নেন সাঈদ আনোয়ার, শহীদ আফ্রিদি, ইজাজ আহমেদ, ইনজামাম উল হক ও সেলিম মালিকের মতো ব্যাটারেরা। তবে মইন খান (৬০) ও মোহাম্মদ ইউসুফ (৫৩) গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলকে ২৩৮ রানে পৌঁছে দেন।

ভারতের শুরুটাও আশাব্যঞ্জক ছিল। রমেশ ও ভিভিএস লক্ষ্মণ দ্রুত ৪৮ রান যোগ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ওয়াসিম আকরাম দুইজনকেই ফিরিয়ে দেন। এরপর সাকলাইন মুশতাক সিরিজে নিজের আধিপত্যের সূচনা করেন। শচীন টেন্ডুলকারকে তৃতীয় বলেই শূন্য রানে ফেরান। পরে দ্রাবিড় ও গাঙ্গুলির জুটিতে ভারত সামান্য ১৬ রানের লিড পায়।

দ্বিতীয় দিনের শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল এক উইকেট হারিয়ে ৩৪ রান। পরের দিনেই শহীদ আফ্রিদি রচনা করেন এক মহাকাব্য।  খেলেন ১৯১ বলে ১৪১ রানের এক ঝড়ো ও ঐতিহাসিক ইনিংস। ইনজামাম (৫১) ও সেলিম মালিক (৩২) তাকে সমর্থন দেন। পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে তোলে ২৮৬ রান। ফলে ভারতের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭১।

চতুর্থ ইনিংসে শুরু থেকেই ভারত ছিল নড়বড়ে। তৃতীয় দিনের শেষে ভারতের স্কোর ছিল ৪০/২। চতুর্থ দিনের সকালে আকরামের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে দ্রাবিড় আউট হন। এরপর সাকলাইন ফিরিয়ে দেন আজহারউদ্দিন (৫) ও গাঙ্গুলিকে (২) । লাঞ্চের আগেই ৮২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে ভারত। ম্যাচ তখন প্রায় হাতছাড়া।

এই অবস্থায় পিঠের ইনজুরি নিয়েও লড়াই চালিয়ে যান শচীন টেন্ডুলকার। মঙ্গিয়াকে সঙ্গে নিয়ে লাঞ্চ থেকে ব্রেক পর্যন্ত উইকেট না হারিয়ে দলকে ম্যাচে ফেরান। নতুন বল নেওয়ার সময় ভারতের দরকার ছিল ৯৫ রান। ইনজুরি থাকা সত্ত্বেও টেন্ডুলকার রান তুলতে থাকেন। পাঁচ ওভারে আসে ৩৩ রান।

মঙ্গিয়া আউট হয়ে গেলেও শচীন লড়াইটা চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ২৫৪। জয়ের জন্য দরকার মাত্র ১৭ রান। টেন্ডুলকার তখন ২৭৩ বলে ১৩৬ রানে অপরাজিত।

কিন্তু সাকলাইনের বলে লফটেড শট খেলতে গিয়ে মিড অফে ওয়াসিম আকরামের হাতে ধরা পড়েন তিনি। কমেন্ট্রি বক্স থেকে বিশ্ববাসীর শুনতে পায় হর্ষ ভোগলের চিৎকার। উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা পাকিস্তান দেশ।

টেন্ডুলকারের বিদায়ের পর দ্রুত গুটিয়ে যায় ভারতের ইনিংস। শেষ তিন উইকেট পড়ে মাত্র ৪ রানে। ২৫৮ রানেই অলআউট হয়ে যায় ভারত। পাকিস্তান পায় ১২ রানের ঐতিহাসিক জয়।

এরপর ঘটে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর একটি। পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা সিজদা করে উদযাপন করেন। আর চেন্নাইয়ের দর্শকেরা নিজেদের দলের হার সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান পাকিস্তানকে।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link