ক্রিকেট আকাশে চেতশ্বর পূজারা মাত্রই যেন এক নিঃশব্দ স্থিরতা ও ধৈর্যের প্রতীক। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রিজে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু লাল বলটার বিপক্ষে যুদ্ধই করেননি, লড়ে গেছেন সময়ের সাথেও। তাঁর ব্যাট যেন বারংবার মনে করিয়ে দিত টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যটা ঠিক কোথায়।
সংখ্যার দিকে দৃষ্টিপাত করলে টেস্ট ক্রিকেটে ১৭৬ ইনিংসে ৪৩.৬১ গড়ে ৭১৯৫ রান করেছেন পূজারা। কিন্তু ক্রিকেট সাহিত্যে তাঁকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে, ছাপিয়ে যেতে হবে সংখ্যাকেও।
তাঁর মাধুর্য লুকিয়ে আছে সেই দীর্ঘ বিকেলগুলোতে, যেখানে তিনি ব্যাট হাতে বোলারদের ঘাম ঝরিয়েছেন। ওভারের পর ওভার খেলিয়ে তাদের পায়ে জমিয়েছেন অবসাদ, আর প্রতিপক্ষের তীব্রতাকে ধীরে ধীরে করে তুলেছেন নিষ্প্রভ।

২০১৮ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে ভারত যখন ৮৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে অনেকটা দিশাহারা, ঠিক তখনই আবির্ভাব ঘটে পূজারার অবিচল প্রতিরোধের। ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি অনিশ্চয়তার ভেতর দাঁড়িয়ে থেকে একটি অসাধারণ শতক গড়েন।
সেই ইনিংসই ভারতকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের পথে এগিয়ে দেয়। এরপর মেলবোর্নে করেন শতক, আর সিডনিতে সেই ১৯৩ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস।
২০২০-২১ সালে ব্রিসবেনে দেখা যায় আরেক রূপের পূজারাকে। চতুর্থ ইনিংসের রান তাড়ায় তাঁর ৭২ রান আসে এমন এক বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে, যারা আজন্মকাল ধরেই হার মানতে নারাজ। স্টার্ক, কামিন্স ও হ্যাজলউডের শর্ট বলে শরীরে আঘাত নিতে নিতে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। গাব্বার গ্যালারি অপেক্ষা করছিল পতনের জন্য, কিন্তু সে আর পতন আসে না। বরং ভারতের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় টেস্ট জয় গড়ে ওঠে তাঁর অটল ধৈর্যের ওপর।

ঘরের মাঠে পূজারার ধৈর্য যেন আরও কঠিন রূপ নিত। ২০১২ সালে আহমেদাবাদে ইংল্যান্ডের বোলারদের তিনি ৫০০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে এক অসহনীয় পরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিয়ে যান। ২০১৭ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে পুনের ধাক্কার পর তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের ৯২ ভারতকে সিরিজে ফেরায়।
স্পষ্টতই পূজারার ব্যাটিং কোনোকালেই সৌন্দর্যের প্রদর্শনী ছিল না। বরং তিনি বোলারদের ক্লান্ত করতেন, তাদের পরিকল্পনা ভাঙতেন, সময় কেড়ে নিতেন। বহু বছর তিনি ছিলেন সেই কাঠামো, যার ওপর দাঁড়িয়েই ভারতীয় টেস্ট দল ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছে।
চেতেশ্বর পূজারা তাই পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্রিকেটপাড়ায় তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন প্রতিটি দীর্ঘ ইনিংসে, যেখানে প্রতিপক্ষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, গ্যালারি অধৈর্য হয়, আর ক্রিকেট যেন ধৈর্যের সৌন্দর্য নতুন করে খুঁজে পায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন নীরব প্রতিরোধও কীভাবে ইতিহাস লিখতে জানে।











