নব্বইয়ের দশকের একেবারে শুরু। ক্রিকেট বিশ্ব তখন এক নতুন বিস্ময়বালকের উত্থান দেখছে। সেই তরুণ শচীন টেন্ডুলকার প্রথমবার পা রাখলেন ক্যাঙ্গারুদের দেশে। অস্ট্রেলিয়ার সেই বিখ্যাত গতিময় বাউন্সি পিচ, গ্যালারি ভরা স্লেজিং আর অজিদের আগ্রাসী ক্রিকেট সংস্কৃতির সাথে তখন কেবল পরিচয় ঘটছে ভারতের এই ব্যাটিং জাদুকরের। পার্থের বিখ্যাত ওয়াকা গ্রাউন্ডে তখন চলছিল এমনই এক স্নায়ুক্ষয়ী টেস্ট লড়াই।
ম্যাচের এক পর্যায়ে শচীন খুব সাধারণ একটি ডিফেন্সিভ শট খেললেন। বলটি ব্যাটে লেগে ঠিক তাঁর পায়ের কাছেই স্থির হয়ে রইল। রান নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ভারতের ঘরোয়া বা জুনিয়র ক্রিকেটে এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটাররা সাধারণত সৌজন্যবশত বলটি হাতে তুলে পাশের ফিল্ডারকে দিয়ে দেন।
সেই সহজাত সৌজন্য থেকেই কিশোর শচীন যখন নিচু হয়ে বলটি কুড়াতে চাইলেন, ঠিক তখনই গালিতে ফিল্ডিং করা অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডারের এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে যেন থমকে গেল পুরো মাঠ। ইতিহাসের অন্যতম জেদী ও লড়াকু এই অধিনায়ক গর্জে উঠে বললেন, “খবরদার! ও বল ছোঁয়ার সাহসও করবে না!”

বোর্ডারের সেই কঠোর বার্তাটি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দানে কোনো সৌজন্য বা হালকা মেজাজের জায়গা নেই। ক্রিকেটের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বল আম্পায়ার ডেড ঘোষণা করা অবধি ক্রিজে থাকা কোনো ব্যাটারই হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারবে না।
শচীন টেন্ডুলকার পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, সেই মুহূর্তে তিনি প্রচণ্ড অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু সেই ধমকটিই ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিষ্ঠুর পেশাদারিত্বের প্রথম পাঠ। তিনি বুঝেছিলেন, মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দেওয়া মানে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটের ‘মর্যাদা’ কিংবা ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’ এর দোহাই দিয়ে অনেক সময় মাঠের নিয়ম শিথিল করার পক্ষে মত দেন অনেকে। ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে পরিচিত ক্রিকেটে সৌজন্য দেখানো ইতিবাচক মনে হলেও, দিনশেষে এটি একটি তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পেশাদার লড়াই।

বোর্ডারের সেই রুক্ষ আচরণ আদতে শিখিয়েছিল যে, ক্রিকেটের মূল নিয়ম হলো প্রতিপক্ষকে কোনোভাবেই এক চুল ছাড় না দেওয়া। মানসিকভাবে হোক কিংবা কৌশলে – যতভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা সম্ভব, সেটাই হলো সত্যিকারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যাকরণ।










