হামজা দেওয়ান চৌধুরীর গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণ এক কিশোরের জীবন থেকে, কিন্তু সেটা আজ হয়ে উঠেছে এক অন্যরকম আখ্যান। বয়স তখন আঠারো পেরিয়েছে সবে, ফুটবলে নামডাক তখনো তেমন হয়নি। কিন্তু ভালোবাসা ঠিকই গর্জে উঠল। অলিভিয়া – ব্রিটিশ মেয়ে, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত। সম্পর্কটা জানাজানি হওয়ার পর বাবা মোরশেদ চৌধুরী একদিন ডাকলেন ছেলেকে। বললেন, ‘হামজা, মেয়েটাকে নিয়ে আসো।’
অলিভিয়া এল। উজ্জ্বল নীল চোখের সেই মেয়েটি তখনো জানত না, সামনে কী অপেক্ষা করছে। ঘরের ভেতরে শান্ত গলায় বলা হলো – ‘আমরা বাঙালি, আমরা মুসলমান। যদি হামজাকে ভালোবাসো, তবে বিয়ে করতে হবে। আর বিয়ে করতে হলে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে।’
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু থমকে গেল। অবিশ্বাসের সুরে অলিভিয়া বলল, ‘কিন্তু আমার পরিবার?’ ভয়, শঙ্কা – সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি। ভুল ধারণা ছিল, ভীতি ছিল।

কিন্তু. বিশ্বাস ছড়ায় আলো। হামজার পরিবারের ধৈর্যে জট খুলতে শুরু করল অলিভিয়ার মনে। দিন কাটতে লাগল। কিছুদিন পর, নিরবে, কাউকে না জানিয়ে ইসলাম গ্রহণ করল সে। তারপর একদিন মসজিদের ইমামকে দিয়ে বিয়ে। ছোট্ট এক ঘরোয়া আয়োজন, সাক্ষী ছিলেন শুধু কাছের মানুষরা।
সেই শুরু। এক বছর শ্বশুরবাড়িতেই ছিল নবদম্পতি। তারপর ধীরে ধীরে হামজা নাম করল, টাকা আসতে লাগল। নতুন ঠিকানায় উঠল তারা। আট বছর পেরিয়ে গেছে ততদিনে। মোরশেদ চৌধুরী আজো গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘অলিভিয়া নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, মিলাদ পড়ে। আমাদের বাড়িতে সপ্তাহে একদিন মিলাদ হয়, তারা আসে।’
অলিভিয়ার পরিবারও শেষমেশ মেনে নিল এই সম্পর্ক। হামজা-অলিভিয়ার ঘর আলোকিত তিন শিশুর কিলকারিতে – দেওয়ান এনায়া হুসাইন চৌধুরী, দেওয়ান ঈসা হুসাইন চৌধুরী, দেওয়ান ইউনুস হুসাইন চৌধুরী।

এই গল্প এখানেই শেষ নয়। মোরশেদ চৌধুরী ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখালেন পুরো বাড়ি। একতলা মসজিদ, দেয়ালঘেঁষে দাদা-নানার কবর। নারীদের নামাজের আলাদা ব্যবস্থা।
দেওয়ান ঈসা হুসাইন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ২০২২ সালে চালু করা হয়েছে বাড়ির পাশেই। অলিভিয়া আর হামজা এতিমখানার জন্য টাকা পাঠায়, ইংল্যান্ড থেকে। ভালোবাসার গল্প এভাবেও লেখা হয়, রক্তের বাঁধনে নয় – বিশ্বাসের বন্ধনে।










