তাঁরাও যদি খেলতেন আইপিএল!

এখনকার যুগের ব্যাটসম্যান বা বোলাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই ইনিংসের শুরু থেকে খেলতে শুরু করেন। আইপিএলের মতো ফ্রাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে কোটি কোটি টাকা দাম ওঠে তাঁদের, কিন্তু যদি দেখা যায় এই কুড়ি বিশের ক্রিকেট যুগের আগেও এমন বহু ভারতীয় ও বিদেশি ক্রিকেটার ছিলেন যাঁরা আজকের দিনের আইপিএলের ঝংকারে হতে পারতেন এক একটি ফ্রাঞ্চাইজি দলের কাছে রত্ন, একেবারে হট কেক যাকে বলে।

একবিংশ শতকের প্রথম দশকের মোটামুটি মাঝামাঝি সময় থেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ও তার পর থেকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) জয়যাত্রা শুরু। এখনকার যুগের ব্যাটসম্যান বা বোলাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই ইনিংসের শুরু থেকে খেলতে শুরু করেন। আইপিএলের মতো ফ্রাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে কোটি কোটি টাকা দাম ওঠে তাঁদের, কিন্তু যদি দেখা যায় এই কুড়ি বিশের ক্রিকেট যুগের আগেও এমন বহু ভারতীয় ও বিদেশি ক্রিকেটার ছিলেন যাঁরা আজকের দিনের আইপিএলের ঝংকারে হতে পারতেন এক একটি ফ্রাঞ্চাইজি দলের কাছে রত্ন, একেবারে হট কেক যাকে বলে।

সেরকমই কুড়ি বিশের ক্রিকেটে এক দারুণ আইপিএলের দল বানানোর চেষ্টা করা যাক কিছু সাবেকদের নিয়ে, যাঁরা কিনা আজকের দিনের যেকোনো আইপিএলের দলকেই মাঠে টেক্কা দিতে পারেন। আইপিএলের নিয়ম অনুযায়ী দলে সাত জন ভারতীয় ও চারজন বিদেশির সমন্বয়ে এই দল বানানোর প্রচেষ্টা। দেখাই যাক না কেমন দাঁড়ায় এই নতুন আইপিএলের দলটা।

প্রথমেই দলটার মোটামুটি প্রথম একাদশ ও তারপরে রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড় কারা থাকতে পারেন তাই নিয়ে আলোচনা করা যাক। মূল একাদশের যদি ওপেনার হিসাবে কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত ও অস্ট্রেলিয়ান মার্ক ওয়াহ থাকেন তবে কেমন হয়?

আশির দশকের ক্রিকেটে একদিনের ম্যাচে মূলত শুরুতে ব্যাট হাতে ঝড় তুলতে দক্ষ ছিলেন শ্রীকান্ত, প্রতি ওভারেই বাউন্ডারি মারার দিকে নজর দিতেন এই বিশ্বকাপজয়ী সাবেক, আর তারপরে লেগ আম্পায়ারের দিকে সরে এসে নানারকম মুখবিকৃতি তাঁর একেবারে ‘সিগনেচার’ ছিল বলা যায়, আইপিএলের বাজারেও এসব যে হিট হয়ে যাবেনা তা কে বলতে পারে।

আর মার্ক ওয়াহ যদি শ্রীকান্তের ওপেনিং পার্টনার হন তাহলে ব্যাপারটা একদম জমে ক্ষীর হয়ে যেতে বাধ্য। নয়ের দশকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ওপেনিং ব্যাটসম্যান আজকের যুগের আইপিএলে যেকোনো দলের সম্পদ হতে পারতেন, সেই সম্পদকে তাই হাতছাড়া করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। মার্ক ওয়ার চোখ জুড়ানো স্ট্রোক প্লের পাশাপাশি দুর্দান্ত ফিল্ডিং আর কার্যকরী অফস্পিন বোলিং একেবারে প্যাকেজ এই দলের।

এবারে আসা যাক মিডল অর্ডারে, সেখানে প্রথম উইকেটটি পড়লে যিনি রাজার মতো চুইংগাম চিবোতে চিবোতে নামবেন তাঁর নামটা বলে দেওয়ার জন্য বিশেষ কোনো পুরস্কার নেই, হ্যাঁ তিনি স্যার আলেকজান্ডার ভিভিয়ান রিচার্ডস। সাতের দশকের শেষ থেকে গোটা আটের দশক জুড়ে ব্যাটহাতে তাঁর ধ্বংসলীলার তান্ডবে ঘুম উড়তো বাঘা বাঘা বোলারদের, আজকের আইপিএলের নিলামে তাঁর দাম কত হতে পারতো? চোখ বুজে কুড়ি কোটি তো বটেই।

যাই হোক ভিভের ধ্বংসলীলা আমরা না হয় আবার মাঠেই দেখবো, এর পাশাপাশি দেখে নিয়ে যাক, চার নম্বরে ব্যাট হাতে যিনি কব্জির মোচড়ে কুড়ি বিশের ক্রিকেট ঝঙ্কারেও তুলির টানে রঙিন ছবি আঁকতে পারবেন তিনি হলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। চার নম্বরে ব্যাটিংয়ে দলের এক বড়ো ভরসা হয়ে উঠতে পারেন আজাহার, আর তাঁর প্ৰিয় ইডেনে খেলাটা হলে তো আর কথাই নেই, ম্যাচের সেরা হওয়াটা তাঁর জন্যই তুলে রাখতে হবে হয়ত!

এর পর পাঁচ নম্বরে নেমে দলকে ভরসা দিতে পারেন ধুন্ধুমার চালিয়ে বা কখনো সখনো ম্যাচ ফিনিশ করে তিনি হলেন অজয় জাদেজা। ৯৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ইনিংস বারে বারে ফিরে আসতে পারে আইপিএলের মঞ্চে। জাদেজার দারুণ ফিল্ডিং আর মিডিয়াম পেস বোলিংও কিন্তু দলের সম্পদ হতে বাধ্য।

এবারে প্রসঙ্গ যখন অলরাউন্ডার, আর সেখানে ভারত ও পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা দুই অলরাউন্ডারের মেলবন্ধন আইপিএলের দুনিয়া দেখবে না, তাই কখনো হয় নাকি? টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমনিতেই অলরাউন্ডারদের দারুন কদর, আর সেখানে যদি একই দলের লোয়ার মিডল অর্ডারে কপিল দেব আর ইমরান খান থাকেন তাহলে তো পোয়া বারো একেবারে।

কপিল ও ইমরান খান

তাই ছয় ও সাত নম্বরে ব্যাট হাতে নামবেন দুই বিশ্বকাপজয়ী অলরাউন্ডার ইমরান খান ও কপিল দেব, যাঁরা তাঁদের ফাস্ট বোলিং দিয়েও শুধু এই দলের সম্পদ হতে পারেন, ভাবুন তাহলে নিলামে কত দাম উঠতে পারে কপিল আর ইমরানের। লোয়ার অর্ডারে আট নম্বরে থাকবেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসাবে ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের জন্য এককালে যিনি দারুন পরিচিত ছিলেন, এ দলের কিপিংয়ের দায়িত্বটা সামলানো আর শেষ দিকে স্লগ ওভারে নেমে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের একটা ১০ বলে ২৫ কিন্তু ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এবার আসা যাক বোলিংয়ে, সেখানে ইতিমধ্যেই কপিল আর ইমরানকে পেয়েই গেছি আমরা, এঁদের পাশে যদি সুইং অফ সুলতান মানে ওয়াসিম আক্রমকে একবার জুড়ে দেওয়া যায়, আইপিএলটা জমে যাবে এক্কেবারে। তবে আক্রমের মতো কাউকে পেতে গেলে গাঁটের কড়ি অনেকটাই গুনতে হবে, অর্থাৎ নিলামে অনেক দরাদরি চলবেই আক্রমকে ঘিরে, নিদেনপক্ষে ১৫ কোটি তো উঠবেই।

সে যাই হোক আমরা যখন ফ্যান্টাসি এই দল বানাচ্ছি সেখানে আক্রাম – কোহলি ডুয়েল দেখার জন্য গাঁটের কড়ি খরচা করাই যায়। বাঁহাতি এই পেসারের ধুম ধারাক্কা ব্যাটিংটাও কিন্তু শেষ দিকে কাজে লেগে যাবে। দলে এবার সবই হয়েছে কিন্তু স্পিনার নেই, হ্যাঁ তাঁরা আসবেন অবশ্যই, এবং একেবারে জোড়া স্পিনার। ভারতের মাটিতে যেহেতু আইপিএল হবে (অবশ্যই করোনা চলে গেলে) তাই দুই স্পিনার লাগবেই।

সুতরাং, ভারতের স্বর্ণযুগের চার স্পিনারের থেকে সেরা দুই স্পিনার যাঁরা টি-টোয়েন্টিতেও কার্যকরী হতে পারেন দারুন ভাবে তাঁদের নেওয়া যাক, একজন হলেন ভগবত চন্দ্রশেখর আর একজন বিষান সিং বেদি। বেদির বাঁহাতি স্পিন আর চন্দ্রশেখরের গুগলি বুঝতে বুঝতে বাকি দলগুলোর না আইপিএলটাই কাবার হয়ে যায়!

রিজার্ভ বেঞ্চেও কারা থাকবেন দেখে নেওয়া যাক, যাঁরা এই ম্যারাথন লিগে কোনো ম্যাচে কারোর পরিবর্ত হিসাবে ছাপ ফেলতেই পারেন। ব্যাটিংয়ে ব্রায়ান লারার মত কিংবদন্তী, যেকোনো দিন যেকোনো ম্যাচ যিনি ঘুরিয়ে দিতে পারেন একার হাতে, সঙ্গে পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসাবে রিচার্ড হ্যাডলিকে তো রাখতেই হবে, এক আধ দিন ইমরান বা আকরামকে বিশ্রাম দিয়ে হ্যাডলি দলে ঢুকবেন, আরেকজন অতিরিক্ত ফাস্ট বোলারও দলে রাখা বাঞ্ছনীয়।

আইপিএলের বাজারে ‘সাদা বিদ্যুৎ’ খ্যাত অ্যালান ডোনাল্ড বল হাতে ছুটে আসছেন রোহিত শর্মাকে বল করতে – এ দৃশ্য দেখার জন্য নিলামে দরদাম করে তাঁকে নিতেই হচ্ছে। আর অতিরিক্ত স্পিনার হিসাবে আব্দুল কাদির থাকুন দলে।

আর বাকি দেশি খেলোয়াড় যাঁদের ছাড়া এই দল হয়ত সম্পূর্ণ হবে না তাঁদের মধ্যে একজন হলেন অলরাউন্ডার হিসাবে রবিন সিং, যিনি ম্যাচ ফিনিশ করে আসার ব্যাপারে যথেষ্টই দক্ষ, উপরি পাওনা তাঁর দুর্দান্ত ফিল্ডিং, সঙ্গী থাকুন মনোজ প্রভাকর, তাঁর অলরাউন্ড দক্ষতাও দলের কাজে লাগতে পারে। অতিরিক্ত পেসার হিসাবে জাভাগাল শ্রীনাথের মতো কিংবদন্তী দলে থাকলে কেউ কোনো আপত্তি তুলবেননা আসা করা যায়, দলের কম্বিনেশন বদলানোর জন্য যেকোনো দিন তাঁকে খেলানোই যায়। অতিরিক্ত উইকেটরক্ষক হিসাবে সৈয়দ কিরমানির বিকল্প দেখছি না।

রবি শাস্ত্রীর মতো কাউকেও দলে রাখা যায়, ব্যাটিংয়ে বেশিরভাগ সময়ে ডিফেন্সিভ খেলা শাস্ত্রী প্রয়োজনে কিন্তু আগ্রাসী হতেই পারতেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর ও কিন্তু ছয় বলে ছয় চক্কর নজির আছে, সঙ্গে থাকছে তাঁর বাঁহাতি স্পিন, প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতেই পারে।

এবারে আসা যাক দলের কোচের প্রসঙ্গে। যে কোচকে বাছার ইচ্ছা, এযুগের টি-টোয়েন্টির দুনিয়া তাঁকে ব্যবহার করার সুযোগই পেলো না, তার আগেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে হলো তাঁকে, হ্যাঁ বব উলমারের কথাই বলা হচ্ছে। তাঁর মতো অত্যন্ত আধুনিকমনস্ক এক কোচ আইপিএলের যেকোনো দল পেলে হয়ত লুফে নিত, আরো নতুন নতুন চিন্তা ভাবনার উদয় হত তাঁর মননের মধ্য দিয়ে।

উলমার যেহেতু দলের কোচ তাই ইমরানের মতো অধিনায়ক থাকতেও তাঁকে অধিনায়ক করার অভিপ্রায় থেকে সরে আসতে হবে, না হলে দুই প্রবল ব্যক্তিত্ববান কোচ-অধিনায়ক দ্বন্দ্বে জেরবার হতে হবে দলকেই, সুতরাং যেহেতু আইপিএলেরই দল তাই বিশ্বকাপজয়ী ভারত অধিনায়ক থাকতে চিন্তা নেই, কপিল ই এই দলের অধিনায়ক। কপিল বনাম ধোনি দুই বিশ্বকাপজয়ীর লড়াই দেখতে সবাই তৈরী তো?

  • একনজরে দেখে নেওয়া যাক পুরো দলটা

মূল একাদশ: কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত, মার্ক ওয়াহ, ভিভ রিচার্ডস, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, ইমরান খান, কপিল দেব (অধিনায়ক), ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার, ওয়াসিম আকরাম, ভগবত চন্দ্রশেখর, বিষেন সিং বেদি।

রিজার্ভ বেঞ্চ: ব্রায়ান লারা, রিচার্ড হ্যাডলি, অ্যালান ডোনাল্ড, আব্দুল কাদির, সৈয়দ কিরমানি, রবি শাস্ত্রী, মনোজ প্রভাকর, রবিন সিং, জাভাগাল শ্রীনাথ।

কোচ: বব উলমার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...