ধূমকেতুসম উত্থান, উল্কার মত নিখোঁজ

ধূমকেতুর মতো উত্থান আবার উল্কার মতো হারিয়ে যাওয়া তবু ইরফান সেই মিষ্টি হাসিটা রেখে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতিটা কোণায়। ঐ ঐশ্বরিক সুইং ক্ষমতা নিয়ে এই দেশে আর কেউ জন্মেছিল কিনা তা হয়ত তর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু গদ্দাফি স্টেডিয়ামের বাইরে যখন পাকিস্তানি ছেলেটা ইরফানকে দেখে বলেছিল, ‘এটা ভারতের ওয়াসিম আকরাম!’সেদিনই হয়ত জিতে গিয়েছিল ইরফানের আজন্ম ক্রিকেট সাধনা।

করাচি স্টেডিয়ামে চকচকে লাল বলটা অধিনায়ক তুলে দিলেন ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার হাতে। নেট প্র‍্যাকটিসে সকলে যেভাবে চমকে উঠত ঠিক সেভাবেই আরও একবার চমকে উঠল ক্রিকেটবিশ্ব।

অবিকল সুইংয়ের সুলতান ওয়াসিম আকরামের মতো রান আপ, বোলিং অ্যাকশনেও অদ্ভুত মিল। প্রথম বলটা সিল্ক আউটসুইংয়ে স্লিপে দ্রাবিড়ের হাতে ক্যাচ তুলে দিলেন সালমান বাট। পরের বলটা ড্রপ খেয়েই ইউনুস খানের প্যাডে আছড়ে পড়ল আর তৃতীয় বলের ইনসুইংটা সবাইকে চমকে মোহাম্মদ ইউসুফের মতো ব্যাটসম্যানকে ক্রিজে শুইয়ে দিয়ে ছিটকে দিল মিডলস্টাম্প।

বরোদার পুরোনো মসজিদে বিশাল বিশাল ঘরের পাশে অনেকটা চওড়া জায়গা। ছোট্ট ইরফান বড় ভাই ইউসুফের সাথে কাঠের টুকরো দিয়ে জোড়ে শট মারত রাবারের বলটায়। কিন্তু ইউসুফের সাথে পেরে উঠত না, একদিন বাধ্য হয়ে বল ছুঁড়লেন ইউসুফকে এবং কী অদ্ভুত বলটা মারতে পারলেন না ইউসুফ!

বাবা মসজিদের মুয়াজ্জিন। সামান্য কিছু রোজগার আর মাথার ওপর ছাদ বলতে ওই মসজিদে রাতটুকু থাকার বরাত। বিরিয়ানি খুব প্রিয় ছিল, ইফতারে অন্যান্য অতিথিদের পাতে সুস্বাদু খাবার এলেও ইরফান আর ইউসুফের জন্য জুটত সকলের খাওয়ার পর বেঁচে থাকা অবশিষ্ট!

রোজ সকালে বলটা কব্জির মোচড়ে দেওয়ালে ছুঁড়ত ইরফান। ইরফান লক্ষ্য করেছিল ভাই ইউসুফ এই কব্জির মোচরটা ধরতে পারে না, আউট হয়ে যায় বারবার। এখানেই শুরু হল দৌড়, ক্রিকেটের বাইশ গজে ইরফান ঢুকে পড়লেন হাতে দুটো ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে।

২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাহির খানের চোট। ব্যস! অ্যাডিলেডের সবুজ ঘাসে জন্ম হল নতুন তারকার। দ্বিতীয় টেস্টে ম্যাথু হেইডেনের উইকেট আর চতুর্থ টেস্টে আগুনে রিভার্স সুইংয়ে কিংবদন্তি স্টিভ ওয়াহ আর অ্যাডাম গিলক্রিস্টের উইকেট তুলে নিয়ে পাঠান চলে এলেন ভারতীয় ক্রিকেটের মূলস্রোতে। অধিনায়ক সৌরভ যে ১৯ বছরের ছেলেটার হাতে চোখ বুজে তুলে দিতেন নতুন বলটা।

আমরা ভুলে যাই নি ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রিভার্স সুইং গুলো। ভুলিনি অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান ব্যাটিং ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সুইংগুলো। ভুলিনি মাত্র ৫৯ ম্যাচে ১০০ উইকেট পাওয়া বিশ্ব রেকর্ডটা। ভুলিনি আইসিসির ২০০৪ সালে তুলে দেওয়া বেস্ট ইমার্জিং প্লেয়ারের ট্রফিটা।

ভুলিনি একদল অপদার্থ ম্যানেজমেন্টের হাতে পড়ে ইরফান পাঠানের মতো প্রতিভাকে ওপেনিং ব্যাটসম্যান বানিয়ে তিলতিল করে ক্যারিয়ারটা শেষ করে দেবার ঘটনাগুলো, ভুলিনি বরোদার সেই মসজিদে বেড়ে ওঠা ছেলেটার হাতদুটো যা দেখে স্টিভ ওয়াহ বলেছিলেন, ‘এই হাতদুটো আমাকে বড় ঝামেলায় ফেলেছিল মাঠের ভেতর।’

ধূমকেতুর মতো উত্থান আবার উল্কার মতো হারিয়ে যাওয়া তবু ইরফান সেই মিষ্টি হাসিটা রেখে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতিটা কোণায়। ঐ ঐশ্বরিক সুইং ক্ষমতা নিয়ে এই দেশে আর কেউ জন্মেছিল কিনা তা হয়ত তর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু গদ্দাফি স্টেডিয়ামের বাইরে যখন পাকিস্তানি ছেলেটা ইরফানকে দেখে বলেছিল, ‘এটা ভারতের ওয়াসিম আকরাম!’

সেদিনই হয়ত জিতে গিয়েছিল ইরফানের আজন্ম ক্রিকেট সাধনা।

এই ভুবি-বুমরাহ’র আগুনে বোলিং-এ আকাশ হয়ত নীল হয়ে উঠবে আরও, সেই নীলে কোথাও সাদা মেঘের ফাঁকেই মেঘে ঢাকা তারা হয়ে আজন্ম থেকে যাবেন ভারতের সুইংয়ের সুলতান ইরফান পাঠান, ক্রিকেট ইতিহাসের বিস্মৃত তারকা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...