বিজয় হাজারে, ভারতীয় ব্যাটিংয়ের আদিস্তম্ভ

ক্রিকেট মাঠে যখন উন্মাদনার তাণ্ডব চলে, তখন কেউ কেউ থাকেন যাঁরা শান্ত স্থৈর্য দিয়ে সময়কে থামিয়ে দিতে পারেন। বিজয় হাজারে ছিলেন ঠিক তেমনই এক চরিত্র। ১৯১৫ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল রান সংগ্রাহক ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মমর্যাদার এক মূর্ত প্রতীক।

ক্রিকেট মাঠে যখন উন্মাদনার তাণ্ডব চলে, তখন কেউ কেউ থাকেন যাঁরা শান্ত স্থৈর্য দিয়ে সময়কে থামিয়ে দিতে পারেন। বিজয় হাজারে ছিলেন ঠিক তেমনই এক চরিত্র। ১৯১৫ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল রান সংগ্রাহক ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মমর্যাদার এক মূর্ত প্রতীক।

১৯৪৭-৪৮ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর। ডন ব্র্যাডম্যানের অজেয় অস্ট্রেলিয়ার সামনে ভারত তখন নবিশ এক শক্তি। সেই সিরিজে অ্যাডিলেড ওভালে হাজারে যা করেছিলেন, তা ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একই টেস্টের দুই ইনিংসে ১১৬ এবং ১৪৫ রান করে তিনি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, ভারতীয়রা কেবল লড়াই করতে জানে না, বিশ্বসেরাদের চোখে চোখ রেখে দাপট দেখাতেও জানে। ব্র্যাডম্যান নিজেই স্বীকার করেছিলেন, হাজারের টেকনিক ছিল নিঁখুত এবং দুর্ভেদ্য।

আন্তর্জাতিক পেরিয়ে বিজয় হাজারের আসল পরিচয়টা ফুটে উঠত রঞ্জি ট্রফির ২২ গজে। বরোদার হয়ে খেলার সময় তিনি যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিলেন, তা আজও রূপকথার মতো শোনায়। ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে তাঁর ৩০৯ রানের ইনিংসটি ছিল সেই সময়ের এক অনন্য কীর্তি। তাঁর ব্যাট যেন ছিল এক অপরাজেয় প্রাচীর, যেখানে বোলারদের সব আক্রমণ এসে ধূলিসাৎ হয়ে যেত।

ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিতভাষী এবং শৃঙ্খলাপ্রিয়। ১৯৫২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই ভারত প্রথমবারের মতো কোনো টেস্ট ম্যাচে জয়লাভ করে। তাও ইংলিশদের বিরুদ্ধে। তাঁর অধিনায়কত্বে কোনো আস্ফালন ছিল না, ছিল নিখাদ দেশপ্রেম এবং খেলার প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

মাঠের বাইরে বিজয় হাজারে ছিলেন নিতান্তই একজন লাজুক প্রকৃতির মানুষ। তিনি মনে করতেন, ব্যাটই কথা বলবে, মুখে অতিরঞ্জিত কথার কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর জীবন ছিল একদম ছিমছাম, যেখানে ক্রিকেট ছিল সাধনার মতো।

পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে ৩০টি টেস্ট ম্যাচে ৪৭.৬৫ গড়ে ২,১৯২ রান সংগ্রহ করেছেন। নামের পাশে রয়েছে সাতটি শতক এবং নয়টি অর্ধশতক হাঁকানোর কীর্তি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সংগ্রহ করেছেন ১৮,৭৪০ রান! গড়টা ৫৮’র চেয়েও বেশি।

বিজয় হাজারের অনন্য ব্যাটিং শৈলী এবং ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০২-০৩ সালে প্রবর্তন করা হয় ‘বিজয় হাজারে ট্রফি’।  বর্তমানে এটিই ভারতের প্রধান ঘরোয়া ওয়ানডে টুর্নামেন্ট। রঞ্জি ট্রফি যেমন লাল বলের আভিজাত্য ধরে রেখেছে, এই ট্রফিও তেমনি সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতীয় প্রতিভা অন্বেষণের মূল ক্ষেত্র।

২০০৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ইহকালের মায়া ত্যাগ করে জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসে পা দিয়েছেন। তিনি আজ শারীরিকভবে বেচেঁ না থাকলেও, ক্রিকেটের অনিমেষ প্রহরে তিনি বেঁচে আছেন এক শুদ্ধতম সাধক হিসেবে। তিনি কেবল এক বিস্মৃতপ্রায় পরিসংখ্যান নন। বরং ভারতীয় ক্রিকেটের সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যাঁর ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই আকাশছোঁয়া গগনচুম্বী সাফল্য।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link