একজন ‘স্যার জাদেজার’ সংগ্রাম

তিনি রবীন্দ্র সিং অনিরুদ্ধ সিং জাদেজা। যাকে বিশ্ব ক্রিকেটে রবীন্দ্র জাদেজা হিসেবেই চেনে। আদর করে সতীর্থরা ডাকে জাড্ডু এবং নিজেই নিজের নামের আগে মজা করে ‘স্যার’ বসিয়ে ফেলেছেন-স্যার জাদেজা।

একটা সময় তার পরিবারকে দিনে ১০ টাকায় সংসার চালাতে হতো। আর আজকে তিনি ৪৫ কোটিরও বেশি টাকার মালিক।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার তিনি। অবশ্য এই সফলতা একদিনে আসেনি, দিনে দিনে নিজের কঠোর পরিশ্রমই তাকে আজ এই পর্যায়ে এনেছে। অভাবের সাথে লড়াই করেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতীয় ক্রিকেট দলে।

দারিদ্রের, বঞ্চনার ইতিহাস পেছনে ফেলে তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। হ্যা, তিনি রবীন্দ্র সিং অনিরুদ্ধ সিং জাদেজা। যাকে বিশ্ব ক্রিকেটে রবীন্দ্র জাদেজা হিসেবেই চেনে। আদর করে সতীর্থরা ডাকে জাড্ডু এবং নিজেই নিজের নামের আগে মজা করে ‘স্যার’ বসিয়ে ফেলেছেন-স্যার জাদেজা।

জাদেজার জন্ম ১৯৮৮ সালের ৬ই ডিসেম্বরে। গুজরাটের নবগ্রামক্ষেত এলাকায় বেড়ে ওঠেন তিনি। বাবা চাকরি করতেন এক বেসরকারী সংস্থার চৌকিদার হিসেবে। মা ছিলেন হাসপাতালের নার্স৷ হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক ছোট বাসায় থাকতেন পরিবারের ৫ জনে মিলে। বাবার ইচ্ছে ছিলো ছেলে যোগ দেবে আর্মিতে। কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকা নিজের বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতেন পাড়ায় ক্রিকেট খেলেই।

একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি হতে পরিশ্রম করতেন৷ তার মাও চাইতেন ছেলে ক্রিকেটার হবে। পাড়ায় তার খেলা দেখে তাকে কোচিং করাতে শুরু করেন পুলিশ অফিসার মাহেন্দ্র সিং চৌহান। পেশায় পুলিশ হলেও ক্রিকেটের চরম ভক্ত ছিলেন তিনি। পাড়ায় কম টাকায় ক্রিকেট শেখাতেন সেই পুলিশ।

জাদেজার বয়স তখন ১৬ বছর।

২০০৫ সালে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু হলো মায়ের। যেই মা তার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে ছিলেন সবচেয়ে অনুপ্রেরণা, সেই মা চলে যাওয়ায় তিনি বেশ ভেঙ্গে পড়েন। এবং সিদ্ধান্ত নেন ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ারও। তার এই অবস্থায় তাকে সামাল দেন তার বড় দিদি নয়না। তিনিও ছিলেন একজন নার্স। দিদির কথাতেই জাড্ডু চালিয়ে যেতে থাকেন ক্রিকেট। তার মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব কাধে নেন তার দিদি। খেয়ে-না খেয়ে থাকা পরিবারের ছেলে ক্রিকেটার হবে সেটা তখন দিবাস্বপ্ন। ক্রিকেটের সরঞ্জামও বেশ ব্যয়বহুল। তার জন্য ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া ছিলো বেশ কঠিন। কিন্তু শুধুমাত্র মৃত মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি চালিয়ে যান ক্রিকেট।

বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ব্যাট, প্যাড ধার করে মাঠে নামতেন তিনি। সাল ২০০৬; একের পর এক বাধা পেরিয়ে অবশেষে অনূর্ধ্ব-১৯ ভারতীয় দলে জায়গা করে নিলেন তিনি। শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত সে আসরে ভারত রানার্স আপ হয়, ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন উইকেট শিকার করেন জাদেজা। এরপর ২০০৮ সালের মালয়শিয়ায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও পেলেন সুযোগ। সেই দলের অধিনায়ক তখন ছিলেন বর্তমান ক্রিকেটের সেরা খেলোয়াড় বিরাট কোহলি। সেবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত। আর সহ-অধিনায়ক অলরাউন্ডার হিসেবে তার নামের পাশেও যোগ হলো কৃতিত্বের ছাপ। ৬ ম্যাচেই শিকার করেন ১০ উইকেট।

২০০৬-০৭ দুলিপ ট্রফিতে অভিষেক হয় প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। পশ্চিম জোনের হয়ে খেলতেন দুলিপ ট্রফি ও সৌরাষ্ট্রর হয়ে খেলার সুযোগ পান রঞ্জি ট্রফিতে। ২০১২ সালে ইতিহাসের ৮ম ও ১ম ভারতীয় হিসেবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিনটি ত্রিপল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি এই কৃর্তী গড়েন।

২০০৮-০৯ রঞ্জি ট্রফিতে দূর্দান্ত পার্ফরমেন্স দেখিয়ে নজর কাড়েন নির্বাচকদের। ৭৩৯ রানের সাথে বল হাতে ৪২ উইকেট। ব্যাস। এরপরই পেলেন বড় সুখবর৷ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো জায়গা পেলেন জাতীয় দলে। আর নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই খেললেন অপরাজিত ৬০ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। এরপরই আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ভাগ্যর চাকা ঘুরে একের পর এক সব ফরম্যাটে জায়গা করে নিলেন তিনি।

২০০৯ এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংলিশদের বিপক্ষে স্লো ইনিংস খেলে হয়েছিলেন সমালোচিত। এমনও মন্তব্য হয়েছিলো যে, তিনি টি-টোয়েন্টি ফর্মেটের জন্য উপযুক্ত নন। ২০০৯ এর শেষ দিকে ইউসুফ পাঠানের অফ ফর্মের কারণে ওয়ানডে দলে সুযোগ মেলে তার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতেই ৪ উইকেট শিকার করে নির্বাচত হন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ।

২০১২-১৩ রঞ্জি ট্রফিতে দূর্দান্ত পার্ফরমেন্স করে সুযোগ পান ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট দলে। ৪র্থ নাগপুরে ইংলিশদের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে শিকার করেন ৩ উইকেট। ২০১৩ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অনবদ্য পারফরম্যান্স করে৷ দলকে করেন চ্যাম্পিয়ন। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১২ উইকেট শিকার করে জিতেন গোল্ডেন বল। ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২ উইকেট শিকারের পাশাপাশি করেন অপরাজিত ৩৩ রান। সেবার আইসিসি ‘টিম অব দ্যা টুর্নামেন্ট’ এর সদস্য হিসেবেও জায়গা পান তিনি। একের পর এক দূর্দান্ত পার্ফরমেন্সে ২০১৩ সালে আইসিসি ওয়ানডে বোলিং র‍্যাঙ্কিয়ের শীর্ষস্থান লাভ করেন তিনি।

২০১৫ বিশ্বকাপে সুযোগ পেলেও ইঞ্জুরিতে মাত্র ৮ ম্যাচে শিকার করেন ৯ উইকেট। পরের সিরিজেই বাংলাদেশের বিপক্ষে বাজে পার্ফরমেন্সের কারণে জায়গা হারান দল থেকেও। সেবার রঞ্জি ট্রফিতে ৪ ম্যাচে ৩৮ উইকেট ও ২১৫ রান করে আবারো নজর কাড়েন নির্বাচকদের। সুযোগ পেয়ে যান পরের দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট সিরিজেও। ভালো পার্ফমেন্স করে সুযোগ পেয়ে যান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে।

তিনি এবং রবীনচন্দ্রন অশ্বিন ইতিহাসের প্রথম দুই স্পিনার হিসেবে আইসিসি বোলিং র‍্যাঙ্কিয়ে ১ নম্বর টেস্ট বোলার নির্বাচিত হন। দ্রুততম বামহাতি বোলার হিসেবে তিনি পৌঁছে যান ১৫০ উইকেটের মাইলফলকে। ২০১৮ সালে টেস্টে দেখা পান ক্যারিয়ারের প্রথম শতকের। ২০১৯ সালে ৩য় ভারতীয় হিসেবে ওয়ানডেতে ২০০০ রান ও ১৫০ উইকেট শিকার করেন তিনি। এরপর জায়গা পান ২০১৯ বিশ্বকাপেও। সে বছরই অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে স্পর্শ করেন ২০০ উইকেটের মাইলফলক।

তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএলে) এখন পর্যন্ত খেলেছেন রাজস্থান রয়েলস ও চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে। ২০১২ আইপিএলে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে দামী ক্রিকেটার। টেস্ট বোলিং র‍্যাঙ্কিয়ে অনিল কুম্বলের পর একমাত্র ভারতীয় হিসেবে হয়েছেন এক নম্বর বোলার। এছাড়াও তার দূর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের কারণেও তিনি বেশ জনপ্রিয়। শুধু ফিল্ডিংই নয় ফিফটি কিংবা সেঞ্চুরির পর তার ‘সোয়ার্ড’ সেলিব্রেশনও এখন বেশ জনপ্রিয়।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ১০৩ ম্যাচ খেলে ৪৭ গড়ে রান করেছেন ৫৮৫৬। আছে ১০ টি শতক ও ৩০ টি অর্ধশতক। বল হাতেও উইকেট শিকার করেছেন ৪২৬ টি। ২৭ বার ৫ উইকেট ও ৭ বার শিকার করেন ১০ উইকেট।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫০ টেস্টে করেছেন ৩৫ গড়ে প্রায় ২০০০ রান, নিয়েছেন বল হাতে ২১৬ উইকেট। আছে ১ শতক ও ১৫ টি অর্ধশতক। বল হাতে ৯ বার শিকার করেছেন ৫ উইকেট ও ১ বার নিয়েছে ১০ উইকেট। বেস্ট বোলিং ফিগার ৪৮ রানে ৭ উইকেট।

১৬৮ ওয়ানডে খেলে ৩২ গড়ে রান করেছেন ২৪১১। আছে ৫০ টি অর্ধশতক, সর্বোচ্চ স্কোর ৮৭। বল হাতে নিয়েছেন ১৮৭ উইকেট, যার মধ্যে আছে একবার ফাইফর। সেরা বোলিং ফিগার ৩৬ রানে ৫ উইকেট।

৫০ টি-টোয়েন্টি তে ১৫ গড়ে রান করেছেন মোটে ২১৭। নেই শতক কিংবা অর্ধশতক। বল হাতে ৩৯ উইকেট শিকারে সেরা বোলিং ফিগার ৪৮ রানে ৩ উইকেট।

জাদেজা ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল বিয়ে করেন রিভা সোলানকিকে। পরের বছর ২০১৭ সালে জুনে জন্ম দেন একটি ফুটফুটে কণ্যা সন্তানের। ২০১৯ সালে তিনি অর্জুনা এওয়ার্ড পান।

ব্যাট-বল হাতে কাগজে-কলমে পরিসংখ্যান গ্রেট ক্রিকেটারদের আশেপাশে না হলেও জাদেজা নিজের অলরাউন্ড পার্ফরমেন্সে ভারতীয় দলকে জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ। তবুও নির্বাচকদের খেয়ালিপনা কিংবা বিভিন্ন কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন বার বার। ঘরোয়া ক্রিকেটে দূর্দান্ত পার্ফরমেন্স করেও অনেক সময়ই মন জয় করতে পারেননি নির্বাচকদের।

মায়ের মৃত্যু কিংবা পরিবারে আর্থিক অনটন কোনোটিই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হতে। সবসময় হাসিমুখ থাকা স্যার জাদেজা নিজের অলরাউন্ড পার্ফরমেন্সে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন আরো উচ্চ পর্যায়ে। ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার হয়তো ক্যারিয়ার শেষে গ্রেটদের তালিকা স্পর্শ করতে পারবে না। তবে সঠিক পরিচর্যা আর নিয়মিত সুযোগ পেলে নিজেকে রেখে যাবেন স্বরণীয়দের তালিকায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...