মাঠের জাদু থেকে অর্থের সাম্রাজ্য

তিনি এক সময়ের দরিদ্র শহর থেকে উঠে আসা এক স্বপ্ন, যে স্বপ্ন প্রতিভা, পরিশ্রম, সাফল্য আর প্রজ্ঞার ছোঁয়ায় আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর পায়ের ফুটবল হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু মেসি নামের উত্তরাধিকার থেকে যাবে বহু প্রজন্মের গল্প হয়ে।

লিওনেল মেসি—নামটা এখন আর শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবলের শিল্পীসত্তা, বাঁ পায়ের জাদু, আর নীরব নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেসি আজ আর শুধু মাঠের কিংবদন্তি নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এক বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি, এক জীবন্ত ব্র্যান্ড। ২০২৫ সাল নাগাদ তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাঁকে সর্বকালের ধনীতম ক্রীড়াবিদদের কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে।

মেসির এই উত্থান রাতারাতি হয়নি। রোসারিওর ছোট্ট এক ছেলের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল যাত্রা। বার্সেলোনার একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর ১৬ বছর বয়সে মূল দলে অভিষেক, আর সেখান থেকেই ইতিহাস লেখা শুরু। প্রায় দুই দশক ধরে বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি যা করেছেন, তা শুধু ট্রফির তালিকায় নয়, ফুটবলের ভাষাতেই বদল এনে দিয়েছে।

১০ টি লা লিগা, চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অসংখ্য কাপের পাশাপাশি ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু—সব মিলিয়ে মেসি হয়ে উঠেছিলেন এক চলমান রেকর্ডবুক। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের পূর্ণতা আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মেসি যেন নিজেই নিজের গল্পের শেষ বাক্যটা লিখে ফেলেন। সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিতর্ক যেন সেখানেই শেষ।

এই অনন্য ফুটবলীয় কীর্তিরই প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর আয়ের অঙ্কে। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মেসির বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে মাঠের পারফরম্যান্স থেকেই এসেছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন। ইন্টার মায়ামিতে তাঁর যোগদান শুধু একটি ক্লাব বদল নয়, পুরো মেজর লিগ সকারের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। দর্শকসংখ্যা বেড়েছে, টিকিটের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, জার্সি বিক্রিতে রেকর্ড ভেঙেছে। এই অভূতপূর্ব প্রভাবকেই এখন সবাই চেনে ‘মেসি এফেক্ট’ নামে।

তবে মেসির প্রকৃত আর্থিক শক্তি তৈরি হয়েছে মাঠের বাইরের দুনিয়ায়। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বাজারদরী ক্রীড়াবিদদের একজন। অ্যাডিডাসের সঙ্গে তাঁর আজীবন চুক্তি থেকে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেন তিনি। বাডওয়াইজার, পেপসি, গ্যাটোরেড, মাস্টারকার্ড, পাবজি মোবাইল—বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি এক রাজা। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী সংখ্যা ৫১০ মিলিয়নের বেশি, আর একটি স্পনসরড পোস্টেই তাঁর আয় প্রায় ২.৭৭ মিলিয়ন ডলার। ফুটবলের মাঠে এক ম্যাচ খেলেই যত মানুষ তাঁকে দেখে, সামাজিক মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি মানুষ তাঁকে প্রতিদিন দেখে—এই বাস্তবতাই মেসিকে বিশ্বব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।

ব্যবসায়িক দিক থেকেও মেসি ভীষণ হিসেবি। স্পেনজুড়ে তাঁর ‘এমআইএম হোটেলস’ চেইন এখন সুপরিচিত নাম। ইবিজা, মায়োর্কা, সিটজেস, কাদিজ, অ্যান্ডোরা—একাধিক জায়গায় তাঁর বিলাসবহুল হোটেল রয়েছে। সব মিলিয়ে হোটেল, অফিস স্পেস আর আবাসিক সম্পত্তি নিয়ে তাঁর রিয়েল এস্টেট পোর্টফোলিওর মূল্য প্রায় ২৩২ মিলিয়ন ডলার।

রোজারিওতে নিজের শহরে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘দ্য ফর্ট্রেস’ নামে পরিচিত এক বিশাল প্রাসাদ, যেখানে অবসরজীবনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বার্সেলোনার উপকণ্ঠে বিমান চলাচল নিষিদ্ধ এলাকায় তাঁর বাড়ি, মায়ামিতে বিলাসবহুল কন্ডো, ফোর্ট লডারডেলে জলঘেঁষা রাজকীয় বাসভবন—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনযাপন যেন ফুটবল রাজপুত্রেরই।

আকাশপথে যাতায়াতের জন্য তিনি লিজ নিয়েছেন একটি গালফস্ট্রিম ভি প্রাইভেট জেট, যার লেজে আঁকা রয়েছে তাঁর প্রিয় ১০ নম্বর। গাড়ির সংগ্রহেও আছে আভিজাত্যের ছাপ—পাগানি জোন্ডা, ফেরারি, মাসেরাটি, ক্যাডিলাক, রেঞ্জ রোভার। আবার পরিবেশের কথাও ভোলেননি তিনি; গ্যারাজে জায়গা পেয়েছে টয়োটা প্রিয়াসের মতো হাইব্রিড গাড়িও।

তবু এই সব সম্পদ, বিলাস আর সংখ্যার বাইরে মেসিকে আলাদা করে চেনায় তাঁর মানবিক দিক। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা লিও মেসি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। খ্যাতি আর অর্থকে তিনি নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও ব্যবহার করতে জানেন—এই জায়গাটাতেই মেসি হয়ে ওঠেন কেবল একজন সফল অ্যাথলেট নয়, এক পূর্ণাঙ্গ আইকন।

লিওনেল মেসি তাই শুধুই সব ধরণের ট্রফি জেতা একজন ফুটবলার নন। তিনি এক সময়ের দরিদ্র শহর থেকে উঠে আসা এক স্বপ্ন, যে স্বপ্ন প্রতিভা, পরিশ্রম, সাফল্য আর প্রজ্ঞার ছোঁয়ায় আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর পায়ের ফুটবল হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু মেসি নামের উত্তরাধিকার থেকে যাবে বহু প্রজন্মের গল্প হয়ে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link