রফিক-রাজ্জাক, টাইগার স্পিনের ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশ ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনের গল্পটা যেন এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার নাম। সেই গল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র- মোহাম্মদ রফিক ও আবদুর রাজ্জাক।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনের গল্পটা যেন এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার নাম। সেই গল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র- মোহাম্মদ রফিক ও আবদুর রাজ্জাক। সময়ের ব্যবধান আছে, প্রেক্ষাপটের পার্থক্যও কম নয়; তবু বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের ইতিহাসে এই দুই নাম প্রায় একই বাক্যে উচ্চারিত হয়। একজন ছিলেন শুরুটা গড়ে দেওয়া কারিগর, আরেকজন সেই ধারাকে টেনে নিয়েছেন অনেক দূর।

বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা খুঁজে পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম ছিলেন রফিক। তার স্পিনে খুব বেশি রহস্য ছিল না- ছিল ধৈর্য, ছিল ফ্লাইট, আর ছিল একই জায়গায় বারবার বল ফেলে ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার এক অদ্ভুত দক্ষতা। অভিজ্ঞতা আর দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা একটা বোলিং আক্রমণের প্রধান অস্ত্র ছিলেন মোহাম্মদ রফিক।

রফিকের আরেকটি বড় শক্তির জায়গা ছিল তার ব্যাটিং। পিঞ্চ হিটার হিসেবে বেশ সুখ্যাতি ছিল তার। নিচের দিকে নেমেও ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো ইনিংস খেলতে পারতেন তিনি, আবার ওপেনিংয়ে নেমেও দ্রুত রান তোলাতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী।

২০০৩ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা তার ১১১ রানের ইনিংস এখনও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। আর ২০০৫ সালে কার্ডিফে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়া ম্যাচে, বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক। প্রথমবারের মতো টাইগাররা বিশ্ব ক্রিকেটকে বড় এক ধাক্কা দিয়েছিল।

রফিকের বিদায়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটি দীর্ঘ সময় ধরে পূরণ করেছেন রাজ্জাক। তিনি ছিলেন তুলনামূলক দ্রুতগতির, অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। ব্যাটসম্যানকে ধৈর্যের পরীক্ষায় ফেলার বদলে তিনি অনেক সময় চাপ তৈরি করতেন গতি আর ধারাবাহিকতায়। মাঝের ওভারগুলোতে রান আটকে রাখা এবং নিয়মিত উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্জাক হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বোলার।

একটা সময় ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির আসনেও ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে দলের স্পিন আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা রাজ্জাক ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টে হ্যাটট্রিক করে নিজের ক্যারিয়ারে যোগ করেন আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

পরিসংখ্যানের খাতায় রাজ্জাক অনেক জায়গায় এগিয়ে থাকবেন, বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও একটা বাস্তবতা আছে। রফিক খেলেছেন এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের ক্রিকেট ছিল আঁতুড়ঘরে- প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী, আর সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। রাজ্জাক তুলনামূলকভাবে পেয়েছেন গড়ে ওঠা একটা দল, উন্নত অবকাঠামো এবং অভিজ্ঞ সতীর্থদের সমর্থন।

তাই এই দুই স্পিনারের গল্প আসলে স্রেফ তুলনার নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিবর্তনের গল্প। একজন সেই ভিত্তি তৈরি করেছেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরের প্রজন্ম নিজেদের শক্তি খুঁজে পেয়েছে। আরেকজন সেই ভিত্তিকে ধরে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে দলকে সেবা দিয়েছেন।

বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনের ইতিহাস লিখতে গেলে তাই শেষ পর্যন্ত দুটি নাম পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়- রফিক এবং রাজ্জাক। একজন শুরু, আরেকজন ধারাবাহিকতা। দুজনেই আলাদা, তবু দুজনেই অপরিহার্য।

লেখক পরিচিতি

রাকিব হোসেন রুম্মান

কর্পোরেট কেরানি না হয়ে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ভাসতে চেয়েছিলাম..

Share via
Copy link