জীবনের মতই ক্রিকেটে সাফল্য আর ব্যর্থতার পার্থক্য চুল সমান। এক মুহূর্ত আগেও একজন ব্যাটার দাপটের সাথে খেলেন, আবার পরের মুহূর্তে তিনি হয়ে যেতে পারেন নিজের ছায়া হারিে ফেলতে পারেন সহজাত ছন্দ। পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ওপেনার সাঈদ আনোয়ারও দেখেছিলেন মুদ্রার দুই পিঠ। গল্পটা ১৯৯৯ সালের ভারত-পাকিস্তান টেস্ট সিরিজের।
লড়াই শুরুর আগে এই ব্যাটার ছিলেন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। দুই বছর আগে চেন্নাইয়ে ১৯৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ভারতকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন তিনি। ভারতের বিরুদ্ধে তার রেকর্ডও ছিল দুর্দান্ত। এছাড়া ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশনে ১১৮ রানের ইনিংস কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাটিতে জোড়া সেঞ্চুরি।
সবমিলিয়ে তাঁর ফর্ম ছিল তুঙ্গে, তাই ঘোষণা দিয়ে বসেছিলেন ভারতের বিপক্ষে ট্রিপল সেঞ্চুরি করবেন। কিন্তু সুতীব্র আত্মবিশ্বাস যেন কাল হয়ে উঠলো তাঁর জন্য।

প্রথম দুই টেস্টেই এই বাঁ-হাতি চরমভাবে ব্যর্থ হন, প্রতিটা ইনিংস তাঁর আত্মবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়ে যায়। এরপরই ইডেন গার্ডেনে শুরু হয় তৃতীয় টেস্ট; হতাশায় ভেঙে পড়া সাঈদ আনোয়ার আরো ভেঙে যান দলীয় ব্যর্থতায়। প্রথম ইনিংসে ১২ বলে শূন্য রান করে ফেরেন সাঁঝ ঘরে। আর পাকিস্তান অলআউট হয়ে যায় ১৮৫ রানে।
যদিও ভারত সেটার ফায়দা নিতে পারেনি, শোয়েব আকতারের দুর্ধর্ষ স্পেলের সুবাদে স্বাগতিকরা থেমে যায় ২২৩ রানে। সেটাই নতুন করে জাগিয়ে তোলে এই কিংবদন্তিকে, নতুন উদ্যমে শুরু হয় পথ চলা।
এর মধ্যে ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলেন তিনি। মাত্র ২ রানে আজহারউদ্দিনের হাতে ক্যাচ তুললেও সেটি ফসকে যায়। এরপরই অন্য রূপে দেখা যায় তাঁকে। চিরপরিচিত মাধুর্য ফুটে উঠে তাঁর ব্যাটে। প্রতিটি শটে ঠিকরে উঠে আত্মবিশ্বাসের ঝলকানি।

এরই মাঝে পাকিস্তান আবার ভেঙে পড়ে। ২৬২/৩ থেকে শেষ ৭ উইকেট মাত্র ৫৪ রানে হারিয়ে বসে। কিন্তু সাঈদ আনোয়ার ছিলেন অবিচল। তিনি একাই একপ্রান্ত আগলে রেখেছিলেন। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল একের পর এক নান্দনিক শট; কভার ড্রাইভ, লেট কাট, পুল, ফ্লিক – সবকিছু ছিল নিখুঁত। দিন কয়েক আগেই দশ উইকেট পাওয়া অনিল কুম্বলেকে পাড়ার বোলারের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ১৮৮* রানে অপরাজিত থাকেন তিনি, প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে হতাশার মাঝে ডুবে যাওয়া এক ব্যাটার পরের ইনিংসে নিজেকে এমনভাবে ফিরে পাবেন, সেটাই ছিল অবিশ্বাস্য।
ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট মানেই আবেগের বিস্ফোরণ। এখানে পারফরম্যান্স শুধু স্কোরবোর্ডে লেখা সংখ্যার চেয়েও বেশি কিছু। সেজন্যই সাঈদ আনোয়ারের ইনিংসটা শুধু রানের হিসেবে বিচার করলে হবে না। এটা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা শেখায়, শেখায় কিভাবে সব ভুলে নিজের সেরাটা বের করে আনতে হয়।

ক্রিকেটের আলোচনা যতদিন চলবে, ততদিনই উঠে আসবে সাঈদ আনোয়ারের নাম। কেবল ক্রিকেটার হিসেবে নয়, নিঃসঙ্গ শেরপার মত লড়াই করে যাওয়া মহারথী হিসেবে। সেই সাথে আলোচনা হবে তাঁর ইনিংস নিয়ে, যা কি না রিডেম্পশনের অনন্য এক উদাহরণ।










