অনেকেই তো স্বপ্ন দেখে, তবে স্বপ্ন ধরতে পারে ক’জন? সেটা হয়তো পেরেছেন শামার জোসেফ। সিকিউরিটি গার্ড থেকে হয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বপ্নদ্রষ্টা। অসম্ভবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভেঙে গড়ে বানিয়েছেন একটা জীবন্ত ইতিহাস। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, বড় হতে হলে আগে পরিশ্রমের সমুদ্রে গা ভেজাতে হয়, স্বপ্ন দেখতে হয় বুকভরা সাহস নিয়ে।
গায়ানার একটা নির্জন প্রত্যন্ত গ্রাম বারাকারা, এই গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর নিউ আমস্টারডাম। গ্রাম থেকে শহরে আসতে হয় নৌপথে, ঘড়ির কাঁটা তখন পার করে ফেলে দু’ঘণ্টারও বেশি। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত ওখানের কেউ জানত না ইন্টারনেট কাকে বলে। সেখানেই জোসেফের জন্ম-বেড়ে ওঠা, সাদাকালো টিভির সামনে বসে সেখানেই প্রথম ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখা।
খেলার মতো কোনো মাঠ ছিল না, ছিল না ফাঁকা জায়গা যেখানে নির্বিঘ্নে একটা শট খেলা যায়, দৌড়ে এসে জোরে বল করা যায়। তবে ইচ্ছে ছিল প্রবল, সেই সাথে কিছু বন্ধু ছিল যারা কল্পনাতেই ঘরকে মাঠ বানিয়ে ক্রিকেট খেলত। কাঠ দিয়ে ব্যাট বানানো গেলেও বল কোথায় পাবে! এই প্রশ্নের উত্তরে জোসেফের হাতে প্রথমে উঠেছিল লেবু, এরপর কাগজ আর বোতল গলিয়ে একটা গোল বল। আর জীবনের একটাই লক্ষ্য—ক্রিকেট খেলতে হবে, ব্যস এতটুকুই।

জোসেফ বড় হলেন, স্বপ্নটা বেড়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা। সেই অজপাড়াগাঁ থেকে নিজেকে নিয়ে এলেন শহরে। শুরু হলো জীবনের সাথে লড়াই। অর্থাভাবে শুরু করলেন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ। এরপর সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব কাঁধে নিলেন। তবে স্বপ্ন তখনো জামার পকেটে থাকা অল্প কিছু টাকার মাঝে হারিয়ে যায়নি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটটা ঠিকই খেলে ফেললেন। জীবনের সেই স্বপ্নটা পূরণ করেছেন, তবে এখানেই থামেননি। গায়ানার হয়ে প্রথম শ্রেণির নজরকাড়া পারফরম্যান্স খুলে দেয় জাতীয় দলের দরজা।
একটা সময় সাদাকালো টিভিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের খেলা দেখেছেন। স্বপ্নের গণ্ডি নিজেই বেঁধে দিয়ে বলেছিলেন, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা তাঁর স্বপ্ন। জাতীয় দলের জার্সিটা গায়ে জড়ানোর ইচ্ছেটা সাহস করে কাউকে বলতে পারেননি।
পরের গল্পটা শুধু নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের খেলা দ্বিতীয় টেস্টে ৭ উইকেট তুলে গ্যাবায় ইতিহাস গড়েছিলেন। সে ম্যাচে নায়ক হয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই তাদের বধ করেছিলেন।

এরপর থেকে ওই অস্ট্রেলিয়াই বনে গেছে তাঁর প্রিয় প্রতিপক্ষ। যতবারই সামনে পেয়েছেন, তাদের বিপক্ষে ততবারই জ্বলে উঠেছেন। ইতিমধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে নয়টি টেস্ট খেলে ৩৮ উইকেট ঝুলিতে পুরেছেন।
জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে স্রেফ একটা স্বপ্নকে পুঁজি করে যে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া যায়, এ যেন এক রূপকথার অবিশ্বাস্য এক গল্প। তবে শামার জোসেফ তো স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে। তাই তো এই রূপকথা বাস্তবে ধরা দিতে বাধ্য হয়েছে।
যে ছেলেটা সাদাকালো টিভির পর্দায় খেলা দেখে ক্রিকেটার হতে চাইতো, এখন সে সত্যি সত্যি ক্রিকেটার হয়েছে। বারাকরার সেই অন্ধকার হয়তো এখন আর নেই, সবার ঘরে রঙিন টিভি হয়েছে। হয়তো অনেকেই সেই টিভিতে দেখছে জোসেফের একেকটা বল, ছোট্ট কিশোরের মন হয়তো স্বপ্ন বুনছে বড় হয়ে শামার জোসেফ হওয়ার।












