ধোনির বায়োপিক যাকে দিয়েছে অনুপ্রেরণা

মোরাদাবাদের মাঠে বারবার অবহেলিত হতে হতে শিবাংয়ের বুক থেকে ক্রিকেটের নেশাটা যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় এক বন্ধুর অদ্ভুত এক পরামর্শে বদলে যায় সব। তার বন্ধু তাকে একটি সিনেমা দেখার অনুরোধ করেছিলেন। যে সিনেমাটি ছিল মহেন্দ্র সিং ধোনির বায়োপিক।

​ভারতীয় রেলওয়ের একজন টিকিট কালেক্টরের ঘরে জন্ম। কিন্তু আজ সেই সাধারণ ঘর থেকেই বিশ্বখ্যাত আইপিএলের আঙিনায় পা রেখেছেন স্পিন অলরাউন্ডার শিবাং কুমার। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের জার্সিতে নিজের প্রথম মৌসুমেই তিনি যেন এক যোগ্য সন্তানের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন, যিনি বুকের রক্ত জল করে তার বাবার অপূর্ণ স্বপ্নকে পূর্ণতা দিচ্ছেন।

​চলতি সপ্তাহে কেকেআর এর বিপক্ষে মাঠ কাঁপিয়ে আসা ২৩ বছর বয়সী শিবাং ক্রিকইনফোকে বলেন, ‘আমার বাবা এক সময় বাংলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ খেলেছিলেন। কিন্তু সংসারের চাপে সাধের ক্রিকেট তাঁকে বিসর্জন দিতে হয়। আজ আমি শুধু আমার নয়, তাঁর সেই অপূর্ণ সাধ পূরণ করার ব্রত নিয়েছি।’

তবে এই সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের ছেলে হলেও তাঁকে ঘরোয়া ক্রিকেটে লড়াই করতে হয় মধ্যপ্রদেশের হয়ে। মোরাদাবাদের মাঠে বারবার অবহেলিত হতে হতে শিবাংয়ের বুক থেকে ক্রিকেটের নেশাটা যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় এক বন্ধুর অদ্ভুত এক পরামর্শে বদলে যায় সব। তার বন্ধু তাকে একটি সিনেমা দেখার অনুরোধ করেছিলেন। যে সিনেমাটি ছিল মহেন্দ্র সিং ধোনির বায়োপিক।

​সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই যেন পুনর্জন্ম হলো তার। ধোনির সেই অদম্য জেদ শিবাংয়ের রক্তে আবার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এক বছরের দীর্ঘ বিরতি ভেঙে যখন তিনি ফের ব্যাটের হাতল ধরলেন, তখন মাঠের চারদিকে কেবল রান নয়, যেন তার অন্তরের আর্তনাদ আছড়ে পড়ছিল। দিল্লির এক ঝানু দলের বিপক্ষে যখন ৯৮ রানের সেই ইনিংসটি খেললেন, তখন শিবাংয়ের মনে আবার নাড়া দিল ক্রিকেট নিয়ে বাবার সেই স্বপ্ন।

মধ্যপ্রদেশ লিগ থেকে শুরু করে বিজয় হাজারে ট্রফি কিংবা সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি – সবখানেই নিজের প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন শিবাং। আইপিএলে যখন নাম লেখানোর পালা, ভাগ্যের দোষে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের ট্রায়ালে অংশ নিতে পারেননি তিনি। তবে ট্রায়াল দিয়েছিলেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও রাজস্থান রয়্যালসে।

যার প্রতিভা সূর্যের মতো দীপ্যমান, মেঘ কি তাকে বেশিক্ষণ ঢেকে রাখতে পারে? মধ্যপ্রদেশ লিগ আর ঘরোয়া ক্রিকেটের সাফল্যের ডানায় ভর করে ৩০ লক্ষ টাকার চুক্তিতে তিনি নাম লেখালেন হায়দ্রাবাদ শিবিরে।

গল্পের শেষটা আসলে কোনো গন্তব্য নয়, বরং এক অনন্ত পথচলার শুরু। শিবাংয়ের বাবা যখন আজ গ্যালারিতে বসেন, তাঁর কানে আর ট্রেনের হুইসেল বাজে না, বরং প্রতিধ্বনিত হয় গ্যালারির গর্জন।

ছেলের ব্যাটে যখন বল লাগে, বাবা তখন নিজের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর শব্দ শুনতে পান। অভাবের কষাঘাতে এক সময় যে হাত থেকে গ্লাভস খসে পড়েছিল, আজ সেই হাতেই ধরা থাকে গর্বের সিক্ত রুমাল।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link