সাইমন টোফেল, নিখুঁত সিদ্ধান্তের আম্পায়ার

এই টাওফেল কিন্তু শুরুতে আম্পায়ার ছিলেন না। নিউ সাউথ ওয়েলসে তার ক্রিকেটজীবন শুরু ফাস্ট বোলার হিসেবে। সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন মাইকেল স্ল্যাটার, অ্যাডাম গিলক্রিস্টদের মতো নাম। কিন্তু চোট—ওই চিরচেনা নিষ্ঠুর শব্দটা—সব হিসাব ওলটপালট করে দেয়।

সেঞ্চুরি থেকে তখন মাত্র নয় রান দূরে। নার্ভাস নাইন্টিজে খ্যাতনামা ব্যাটারের মাথাতেও যে ভূত ভর করতে পারে, সেটা হয়তো সেদিনই বোঝা গিয়েছিল।

পল কলিংউড বল করলেন, অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করল বল। গ্রেট ব্যাটার প্যাড এগিয়ে দিলেন বলের লাইনে, বল গিয়ে পড়ল পায়ের ওপর, জায়গাটাও অফ স্টাম্পের বাইরেই। আবেদন খুব একটা জোরালো নয়, কিন্তু আম্পায়ারের আঙুল উঠে গেল। ভারতীয় সেই ক্রিকেট দেবতা বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করলেন না।

তিনি দ্বিতীয়বার আর ভাবলেন না—চিরচেনা ভদ্রতা আর আত্মসম্মান নিয়ে সোজা হাঁটা ধরলেন প্যাভিলিয়নের দিকে। পরদিন ম্যাচের ফাঁকে সেই আম্পায়ার নিজেই লিটল মাস্টারকে ডেকে নিলেন। বললেন, ভুল হয়ে গেছে, দু:খিত। ব্যাটার হেসে জবাব দিলেন, ‘আপনি তো খুব কমই ভুল আউট দেন। এটা হতেই পারে, কোনো ব্যাপার না।’

সালটা ২০০৭, ট্রেন্টব্রিজ টেস্ট। ব্যাটারের নাম শচীন তেন্ডুলকার, আর আম্পায়ারের নাম—সাইমন টোফেল।

এই টাওফেল কিন্তু শুরুতে আম্পায়ার ছিলেন না। নিউ সাউথ ওয়েলসে তার ক্রিকেটজীবন শুরু ফাস্ট বোলার হিসেবে। সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন মাইকেল স্ল্যাটার, অ্যাডাম গিলক্রিস্টদের মতো নাম। কিন্তু চোট—ওই চিরচেনা নিষ্ঠুর শব্দটা—সব হিসাব ওলটপালট করে দেয়।

খেলাটা ছাড়তে হয়। তখন বয়স অল্প, জীবনটা সামনে পড়ে আছে, রোজগারের তাগিদও আছে। সেখান থেকেই আম্পায়ারিং শেখা শুরু। বয়স তখন সবে কুড়ি। ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, কিন্তু অবিশ্বাস্য নিখুঁততায় তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের সেরা আম্পায়ারদের একজন।

মজার ব্যাপার, টোফেল নিজে একটু কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। প্রতি ম্যাচে স্টেডিয়ামে যাওয়ার বাসে তিনি একই সিটে বসতেন। পয়া সিট। অভ্যাস না কি বিশ্বাস—সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু ২০০৯ সালের এক মার্চ, লাহোরে পাকিস্তান বনাম শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় টেস্টে সেই নিয়ম ভাঙল।

সেদিন টোফেলের পয়া সিটে বসলেন রিজার্ভ আম্পায়ার আহসান রাজা। তারপর যা ঘটল, ক্রিকেটবিশ্ব তা কোনোদিন ভুলবে না। সন্ত্রাসবাদী হামলায় রক্তাক্ত হয়ে উঠল মাঠের বাইরের রাস্তা। গুরুতর আহত হলেন আহসান রাজা। টাওফেল সেদিন অজান্তেই জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলেন—নিজের সিটে না বসে।

আসলে সাইমন টোফেল ছিলেন পেশাদারিত্বের প্রতিমূর্তি। মাঠে নামতেন স্পাইক দেওয়া জুতো পরে, যেন হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় সামান্য অসুবিধাও মনোযোগ নষ্ট না করে। ফিটনেস, ফোকাস—সবকিছুর প্রতি ছিল অদ্ভুত যত্ন। আর তার সঙ্গে ছিল সেই বিখ্যাত সিক্সথ সেন্স।

২০০৪ সালে করাচিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ইনজামাম উল হকের কট বিহাইন্ড—মাঠে কেউ স্পষ্ট শব্দ পেল না, আবেদনও ছিল হালকা। কিন্তু টাওফেল আউট দিয়ে দিলেন। পরে রিপ্লেতে দেখা গেল, ঠিকই সিদ্ধান্ত। যেন তিনি চোখের বাইরেও কিছু দেখতে পেতেন।

এই নিখুঁততার স্বীকৃতি হিসেবে টানা পাঁচবার—২০০৪ থেকে ২০০৮—আইসিসির বর্ষসেরা আম্পায়ার নির্বাচিত হন তিনি। অথচ এমন উচ্চতায় পৌঁছেও থামতে জানতেন। মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে আম্পায়ারিং ছেড়ে দেন।

কারণ খুব সাধারণ—পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। জীবনের শেষ বড় সিদ্ধান্তটাও তিনি ভুল নেননি। ক্রিকেট মাঠে যেমন, মাঠের বাইরেও ঠিক তেমনই—সাইমন টাওফেল মানেই নির্ভুলতা, দৃঢ়তা আর সাদামাটা এক বীরত্ব, যেখানে ভুলের কোনো মাশুল নেই।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link