অকালে নিভে যাওয়া উজ্জ্বলতম আলো!

হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে তখন থমথমে নীরবতা। ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি গায়ে দাঁড়িয়ে এক বাংলাদেশি ডিফেন্ডার বলেছিলেন, ‘আমাকে দশটা মিনিট সময় দেন, আমি যদি জিতাইতে না পারি, ভারতবর্ষে পা রাখব না।’ ওই ম্যাচে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে তিনি দলকে জিতিয়েছিলেন। তাঁর অ্যাসিস্টেই মর্যাদার লড়াই জিতেছিল ইস্ট বেঙ্গল।

হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে তখন থমথমে নীরবতা। ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি গায়ে দাঁড়িয়ে এক বাংলাদেশি ডিফেন্ডার বলেছিলেন, ‘আমাকে দশটা মিনিট সময় দেন, আমি যদি জিতাইতে না পারি, ভারতবর্ষে পা রাখব না।’ ওই ম্যাচে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে তিনি দলকে জিতিয়েছিলেন। তাঁর অ্যাসিস্টেই মর্যাদার লড়াই জিতেছিল ইস্ট বেঙ্গল।

‘ডিফেন্ডার’ শব্দটা অনেকেই শুধু রক্ষণভাগের খেলোয়াড় বোঝাতে ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবলের অভিধানে এই শব্দটার আরেকটা অর্থ আছে, মোনেম মুন্না।

মাঠে তিনি ছিলেন প্রাচীর, ড্রেসিংরুমে ছিলেন নেতা, আর গ্যালারিভর্তি দর্শকদের কাছে ছিলেন বিশ্বাসের আরেক নাম। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের ফুটবল যখন নিজেদের পরিচয় খুঁজছে, তখন রক্ষণভাগে দাঁড়িয়ে একাই যেন মানচিত্র এঁকেছিলেন মুন্না। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকাররা জানতেন, সামনে যদি ‘কিংব্যাক’ থাকে, তাহলে গোলপথটা আর সোজা নয়।

দেশের ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবদান শুধু পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়, সাফল্যও এসেছে তাঁর হাত ধরে। ১৯৯৫ সালে মায়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতির টুর্নামেন্টে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ জেতে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। সেই ট্রফি ছিল এক নতুন সূচনা, বিশ্বাসের, সম্ভাবনার, আত্মমর্যাদার।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আস্থার প্রতীক। শুধু খেলোয়াড় নয়, অধিনায়ক হিসেবেও নেতৃত্ব দিয়েছেন লাল-হলুদদের। ভারতের মাটিতে কোনো ভারতীয় ক্লাবের অধিনায়কত্ব করা প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে গড়েছেন অনন্য ইতিহাস।

ক্লাব ফুটবলে তাঁর মূল্য ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তাঁকে দলে ভেড়াতে আবাহনীকে গুনতে হয়েছিল ২০ লাখ টাকা, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে ছিল বিস্ময়কর অঙ্ক। এটা শুধু অর্থের হিসাব নয়, এটা ছিল তাঁর মানের স্বীকৃতি। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে অর্থমূল্যের বিচারে সবচেয়ে দামী ফুটবলারদের একজন, এই তকমাও তাঁর প্রাপ্য।

মাত্র ৩১ বছর বয়সে বুট তুলে রাখেন মুন্না। এর ঠিক আট বছর পর জীবনের জ্বালানি ফুরিয়ে যায় তাঁর। যেন সময়ের আগেই কেউ নিভিয়ে দেয় সবচেয়ে আলো দেওয়া প্রদীপটাকে।

“হি ইজ মিস্টেকলি বর্ন ইন বাংলাদেশ।” জার্মান কোচ অটো ফিশার তাঁর প্রতিভার পরিমাপ হিসেবে এই লাইনটাই উচ্চারণ করেছিলেন। মোনেম মুন্না ছিলেন আন্তর্জাতিক মানের ডিফেন্ডার, যিনি জন্মেছিলেন এই দেশের মাটিতে, এই দেশের জার্সির জন্য।

লেখক পরিচিতি

প্রত্যয় হক কাব্য

স্বপ্ন লেখার কি-বোর্ড

Share via
Copy link