ঝড়ের প্রকোপ থেমে গেলে প্রকৃতি শান্ত হয়ে আসে

সে বড় হতে লাগল আকাশে উড়তে থাকা পাখির মতো। কখনো টেনিস কোর্টে তার ফোরহ্যান্ড নজর কাড়ত, কখনো দেখা যেত ভলিবলের মাঠে তার চঞ্চলতা, কখনো গলফের ব্যাট হাতে তার নিখুঁত সব শট। এখানেই যে শেষ নয়, সাঁতার প্রতিযোগিতায়ও সে ছিল সবার সেরা।

বাবা চিকিৎসক, ছেলেরও মেধাশক্তি প্রখর। সবাই ভেবেছিল ছেলেটাও হাঁটবে বাবার পথে। তবে সেই ছেলে বেছে নিল অন্য পথ, যে পথে সময় থমকে যায়, পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়। যে পথ কেবলই কিংবদন্তির গল্প লেখে।

ক্রিকেট আকাশ জুড়ে যত তারা উঠেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা বোধহয় আব্রাহাম বেনজামিন ডি ভিলিয়ার্স। জন্মটা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া শহরে ১৯৮৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। বাবা ছিলেন রাগবি ইউনিয়ন দলের খেলোয়াড়। জন্মসূত্রেই তাই এবির শরীরে ছিল এক চনমনে রক্ত।

স্কুলজীবনে প্রবেশ করলেন যখন, সেখানেও তাক লাগিয়ে দিল ওয়ার্মবাডের ছোট্ট ছেলেটা। পড়াশোনায় ভীষণ সিরিয়াস সে। গণিত আর বিজ্ঞানই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। শিক্ষকেরা বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলেটা বিশেষ ধাতুতে গড়া, একদিন নাম করবে ঠিকই। তবে তাঁরা জানতেন না, ছোট্ট ছেলেটার ছায়ামূর্তিতে লুকিয়ে ছিল ভিন্ন এক চরিত্র।

সে বড় হতে লাগল আকাশে উড়তে থাকা পাখির মতো। কখনো টেনিস কোর্টে তার ফোরহ্যান্ড নজর কাড়ত, কখনো দেখা যেত ভলিবলের মাঠে তার চঞ্চলতা, কখনো গলফের ব্যাট হাতে তার নিখুঁত সব শট। এখানেই যে শেষ নয়, সাঁতার প্রতিযোগিতায়ও সে ছিল সবার সেরা।

বিধাতা বোধহয় সবটাই তাঁকে দিয়েছেন, সবটা উজাড় করেই দিয়েছেন। নইলে কি আর পড়ার টেবিলে বসে থাকা শান্ত, কোমল হৃদয়ের এক ছোকরা যখন ক্রিকেটের ব্যাট হাতে তুলে নিত, তামাম দুনিয়ার কেউ তাকে চিনতেই পারত না। তার ব্যাট সুইং সৃষ্টি করত এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়।

পেশাদার ক্রিকেটের যাত্রাটা শুরু ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে। সেন্টুরিয়নে অনুষ্ঠিত ম্যাচে নর্দার্নসের হয়ে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার। একই বছরের নভেম্বরে লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে ইস্টার্ন প্রভিন্সের বিরুদ্ধে খেলেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। সেই শুরু থেকে দীর্ঘ পথচলায় তিনি হয়ে ওঠেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তখন থেকেই ক্রিকেটের নতুন পাঠ্যবইয়ের বড় অধ্যায় লেখা শুরু করেন এবি। ব্যাট হাতে বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে আসা এবির জন্য আন্তর্জাতিক ময়দানের দরজা খুলতে বেশি সময় লাগেনি। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আভিজাত্যের সাদা পোশাক গায়ে চাপান ক্রিকেটের এই বিস্ময়। ধাতস্থ হতে একটু সময় লেগেছিল তার। ক্রিকেট জগতের চারপাশটা যেন একটু মাপঝোক করে নিয়েছিলেন। এরপর থেকেই শুরু তার রাজত্বকাল।

যে বলটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলা বাধ্যতামূলক, সেটাকেই ভিলিয়ার্স পাঠাতেন মাঠের বাইরে। এমন সব শটের জন্ম দিলেন, যা কেউ আগে দেখেনি, আগে কল্পনাও করেনি। বোলারদের কাছে এমন কোনো অস্ত্র ছিল না, যা এবিকে দমাতে পারে। অবশ্য মাঠের চারপাশে যার বিচরণ সমান তালে, তাকে কোন বলটাই বা আটকে রাখবে! সবাই বুঝে গেল, এই ছেলে আর পাঁচজন ব্যাটারের মতো নয়। তাই তো উপাধি দেওয়া হলো, ‘মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি’।

ওয়ানডে ফরম্যাটকে আপন করে নিলেন, নিজের মতো করেই নিজের নিয়মে চলতে থাকলেন। লক্ষ্য একটাই, সমস্ত রেকর্ড নিজের নামের পাশে টেনে আনা, করলেনও তাই। দ্রুততম ফিফটি, সেঞ্চুরি, এমনকি ১৫০ রানও। গোটা বিশ্ব অবাক তাকিয়েই দেখল তার ঔদ্ধত্য, ব্যাট হাতে এবির পাগলামি।

টি-টোয়েন্টির রঙিন দুনিয়াতেও নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে কদর বাড়ল তার, বোলারদের ঘুম হারাম করে ছাড়লেন প্রতিনিয়ত। তবে এমন ধ্বংসযজ্ঞের আড়ালে একটা জিনিস চাপা পড়ে যাচ্ছিল, সফেদ পোশাকে এক ভিন্ন ব্যাটারের গল্প।

জোয়ার যেমন ভাটায় পরিণত হয় সময়ের তাগিদে, ঝড়ের প্রকোপ থেমে গেলে প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়ে আসে, তেমনই টেস্ট ফরম্যাটে ভিলিয়ার্স ছিলেন বরফ-শীতল এক নাম। যার ৩১ বলে শতক হাঁকানোর ক্ষমতা আছে, সেই কিনা ৪৩ রান করতে খেলেছেন ২৯৭ বল। ৩৫৪ মিনিট ধরে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাইশ গজে।

বোলাররা স্রেফ অসহায় হয়ে একের পর এক বল করে গেছেন। ভারতের বিপক্ষে সেই ইনিংসটা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও ২২০ বলে মোটে ৩৩ রান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১১৩ বলে ২০, এমন কত গল্পই তো আছে! দলের প্রয়োজনে যে এবি এক শান্ত নদীতে পরিণত হতেন।

২০ বছরের মাথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখা সেই ছেলেটা বিশ্বক্রিকেটে যেন এসেছিল রেকর্ড গড়ার জন্যই। সাদা পোশাকে ২০০৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১১৪টি টেস্টে খেলে করেছেন ৮৭৬৫ রান। গড় ছিল ৫০.৬৬, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটারদের কাতারে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেয়। তবে ওয়ানডেতে এবি ছিলেন আরও বেশি ভয়ংকর।

আধুনিক ক্রিকেটের নিয়মকানুন ওলট-পালট করে ২২৮টি ম্যাচে ৯৫৭৭ রান করেছেন ৫৩.৫০ গড়ে। স্ট্রাইক রেট ছিল ১০১, যা একই সঙ্গে ধারাবাহিকতা ও আগ্রাসনের প্রতিফলন। নামের পাশে রয়েছে ২৫টি শতক ও ৫৩টি অর্ধশতক।

ক্রিকেট ইতিহাসে এবির মতো ব্যাটার খুব কমই এসেছে। ক্রিকেটের পুরোনো মলাট পাল্টে যে ভিন্ন ধারা দেখিয়েছিলেন, সেটাই তাকে কিংবদন্তি করে তুলেছে। ২২ গজে ঝড় তুলতে যেমন সিদ্ধহস্ত ছিলেন, তেমনই ছিলেন ক্রিকেট ব্যাকরণের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র।

ক্রিকেট কাঁদায়, ক্রিকেট হাসায়, একটা সময় পর্যন্ত সবই মেনে নেওয়া যায়। তবে যে জিনিসটা মেনে নিতে কষ্ট হয়, তা হলো বিদায়। এবি চলে গেছেন, তবে রেখে গেছেন সেই অধ্যায়, যা তাকে মনে করাবে ক্রিকেট যতদিন থাকবে, ২২ গজের লড়াই যতদিন গ্যালারিতে বসে দর্শক দেখবে। হয়তো দূর থেকে কোথাও এক নক্ষত্র জ্বলে জ্বলেই জানিয়ে দেবে, ‘আমি ছিলাম বলেই তো এত কিছু হয়েছিল।’

লেখক পরিচিতি

প্রত্যয় হক কাব্য

স্বপ্ন লেখার কি-বোর্ড

Share via
Copy link