২০০৬ সালের ২০ আগস্ট। কেনিংটন ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে চলছে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান চতুর্থ টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা। ইংল্যান্ড তখন দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে। ৫৬তম ওভারের পর শুরু হলো চা বিরতি। এর মধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে ইংল্যান্ডকে পাঁচ রান পেনাল্টি দেন আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার। বদলাতে বলেন বলও। ব্যস! তাতেই চটে পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা আর নামলেন না নির্ধারিত সময়ে মাঠে। ফলাফল? ইংল্যান্ডকে বিজয়ী ঘোষণা করেন হেয়ার, আর ১২৯ বছরের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লেখা হয় ফোরফিটের গল্প!
পাকিস্তান অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হকের দলের কাছে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ ছিল স্রেফ অপমানজনক এক তকমা। ইতোপূর্বে ১৯৯২ সালেও ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়ে একই ধরনের অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছিল উপমহাদেশের দলটি। অবশ্য তখন রিভার্স সুইংয়ের রহস্য সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই অনেকের ধারণা ছিল: পাক বোলাররা বলকে টেম্পারিং করে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করে উইকেট শিকার করতেন!
কিন্তু সেই রহস্য যখন পরিষ্কার, তখন ফের একই ধরনের অভিযোগ তোলায় অপমানবোধের অনলে যেন ভস্মীভূত হচ্ছিল ইনজামাম বাহিনী! এমনকি আম্পায়ার হেয়ার অভিযোগটি তুলে থ্রি লায়ন্সদের পাঁচ রান পেনাল্টি দেওয়ার পর চতুর্থ আম্পায়ার ট্রেভর জেস্টিকে নতুন বল নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। তিনি এক বাক্স বল আনার পর সেখান থেকে বল বেছে নেওয়ার সুযোগ পান ইংল্যান্ডের হয়ে ক্রিজে থাকা ব্যাটার কেভিন পিটারসেন ও পল কলিংউড। যা পাকিস্তান দলের ক্ষোভের আগুনের আঁচ আরও বাড়িয়ে দেয়!

এরপর চা-বিরতির পর আলোক স্বল্পতার ঝক্কি কাটিয়ে ক্রিজে নামেন ইংলিশ ব্যাটাররা। মাঠে আসেন আম্পায়ার হেয়ার ও বিলি ডকট্রোভ। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার সময় থেকে ১০ মিনিট পার হয়ে গেলেও পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমের দরজা খুলে কেউ বাইরে আসেননি। তবু আম্পায়াররা মাঠে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন ২০ মিনিট।
আর তারপরই সূত্রপাত টেস্ট ইতিহাসের নাটকীয় মুহূর্তের! হেয়ার ও ডকট্রোভ দুই ইংলিশ ব্যাটারের সঙ্গে কথা বলেন, এরপর স্টাম্পের বেল তুলে নিয়ে মাঠ ছাড়েন ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করে। আর ক্রিকেটের ইতিহাসে জন্ম নেয় একমাত্র ফোরফিটের ঘটনা।
অবশ্য বিকেলে ইনজামামের দল ফের মাঠে নামে খেলা চালিয়ে যেতে। কিন্তু এবার বাদ সাধেন হেয়ার! তিনি মাঠে নেমে পুনরায় খেলা পরিচালনা করতে অস্বীকৃতি জানান! ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) চেয়ারম্যান ডেভিড মরগ্যান ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান শাহরিয়ার খানসহ দুদলের কোচিং স্টাফ আর খেলোয়াড়দের অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েননি একরোখা হেয়ার! ফলে দর্শকদের টিকিটের প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় ইসিবি।

পাঁচ ম্যাচের সেই টেস্ট সিরিজটিতে তিন ম্যাচ খেলে তখন ২-০ ব্যবধানে স্বাগতিকরা এগিয়ে ছিল। তাই চতুর্থ টেস্টে পাকিস্তান জয়ী হলে খুব একটা ফলের পরিবর্তন ঘটত না। তবে ওভালের ম্যাচে থ্রি লায়ন্সদের বেশ চাপে ফেলেছিল পাকিস্তান। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডকে ১৭৩ রানে থামিয়ে দেওয়ার পর ৫০৪ রান করে বড় লিড নিয়েছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসেও স্বাগতিকরা স্কোরবোর্ডে ২৯৮ রান যোগ করতে গিয়ে চার উইকেট হারায়। কিন্তু এরপর হেয়ারের বিতর্কিত কাণ্ডের জেরে পুরো ম্যাচটাই ভেস্তে যায়!
পরে ২০০৭ সালে ওভাল কাণ্ড নিয়ে তদন্ত শেষে আইসিসি জানায়, সেই ম্যাচে পাকিস্তানি বোলারদের বল টেম্পারিংয়ের কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে খেলা বন্ধ রাখার দায়ে ইনজামাম নিষিদ্ধ হন চারটি ওয়ানডে ম্যাচে।
শাস্তির সম্মুখীন হন আম্পায়ার হেয়ারও। ২০০৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সকল দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চার মাস তিনি ছিলেন না কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার কাজেও। আইসিসির এলিট প্যানেলের এই আম্পায়ারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোরও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একরোখা হেয়ার তাতেও জল ঢেলে দেন এম্প্লয়মেন্ট ট্রাইব্যুনালে বর্ণবাদের মামলা ঠুকে!

পরে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় বিতর্কিত সেই ম্যাচের ফলাফলকে ‘ড্র’ ঘোষণা করার চেষ্টা করে আইসিসি। কিন্তু শেষমেশ ইংল্যান্ডের জয় হিসেবেই তা ইতিহাসে ঠাঁই পায়—বিশ্ব ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকায় থাকা মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের হস্তক্ষেপে।
ওভালের সেই ক্রিকেটীয় নাটক আজও ক্রিকেট ইতিহাসের এক অমীমাংসিত এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় হয়ে আছে ক্রিকেটমোদীদের স্মৃতিতে। হয়তো যতদিন ক্রিকেটাররা সাদা পোশাক গায়ে জড়িয়ে লাল বলের উন্মাদনা ছড়াবেন দর্শকদের হৃদয়ে, ততদিনই ইনজামাম আর হেয়ারের এই ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক থাকবে সময়ের বেড়াজাল পেরিয়ে!










