টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নিয়ে যে টানাপোড়েনটা এতদিন চাপা গুঞ্জন ছিল, সেটা এবার প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রস্তুতি নিচ্ছে আইসিসির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে যাওয়ার—ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস আরবিট্রেশন কোর্টে (সিএএস)।
কারণটা পরিষ্কার: ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব ও প্রামাণ্য শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও, ভারত–সমর্থিত আইসিসি বাংলাদেশকে জোর করে ভারতে খেলতে বাধ্য করতে চাইছে। এমনকি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য বিসিবিকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই জায়গায় এসে বিসিবি আর বাংলাদেশ সরকার—দু’পক্ষই অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না। ফলাফল হিসেবে বিসিবি এখন আইসিসির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বোর্ড–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আইসিসি ও ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের হাতে শক্ত আইনি ভিত্তি ও পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে, যার ফলে আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাও নাকি যথেষ্ট উজ্জ্বল।

লড়াইটা অসম, সেটা সবাই জানে। তবু বাংলাদেশ এবার নতজানু না হয়ে চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর পথটাই বেছে নিয়েছে। এই সাহসী অবস্থানের জন্য বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ভবিষ্যতে আলাদা করে মনে রাখা হবে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। এমনকি খোদ আইসিসিতে তাঁর অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তবে গল্পের আরেক পিঠও আছে, যেটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আইসিসির দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ক্ষেত্রে ভারতের জন্য হাইব্রিড মডেল করা হলো, অথচ বাংলাদেশ চাইছে না বলেই তাদের জোর করে ভারতে পাঠানো হচ্ছে—এটা নি:সন্দেহে ডাবল স্ট্যান্ডার্স।
কিন্তু, ক্রিকেট অর্থনীতির ন্যূনতম ধারণা যাদের আছে, তারা এটাও বোঝেন কেন এমনটা হচ্ছে। ভারত ছাড়া কোনো টুর্নামেন্টে কার্যত রাজস্বই নেই। আর বাংলাদেশ বাদ পড়লে? আইসিসির ক্ষতি হবে ঠিকই, কিন্তু সেটা সামাল দেওয়ার মতো।

যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগে ভেসে বিসিবিকে বলছেন আইসিসিকে সিএসএস-এ নিয়ে যেতে—বাস্তবতা হলো, এটা এতটা সহজ নয়। আইনি লড়াইয়ে নজির বা প্রিসিডেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ ও ২০০৩ বিশ্বকাপে যে দলগুলো নির্দিষ্ট দেশে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল—এই ইতিহাস আইসিসির হাতকেই শক্ত করে। ফলে বিসিবির আইনি অবস্থান বাস্তবে খুব মজবুত নয় বলেই অনেকের মত।
এর ওপর আরেকটা বড় যুক্তি আইসিসির হাতে আছে। বাংলাদেশের সব ম্যাচই যেহেতু ভারতে নির্ধারিত, আইসিসি সহজেই বলতে পারে—বাংলাদেশ সরে দাঁড়ালে টুর্নামেন্টের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই যুক্তিতে তারা বিকল্প দল যুক্ত করার পথও খুলে রাখতে পারে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশটা হল—এই অবস্থানে আসার আগেই বিসিবির হাতে একটা ভালো সুযোগ ছিল। বিসিসিআই যখন মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে ফেরার সুযোগ দিতে চেয়েছিল, তখন সেটা ছিল দর কষাকষির একটা শক্ত কার্ড। কিন্তু অতি-আবেগী বিসিবি সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

নিজের হাতে কতটা শক্তি আছে, সেটা না বুঝেই জুয়া খেলেছে—আর সেটাই বিসিবির চিরাচরিত অদক্ষতার আরেকটা উদাহরণ হয়ে রইল। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে দুটো পথই নেতিবাচক।
হয় পুরোপুরি নত হয়ে যেতে হবে, না হয় এমন এক অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হবে, যেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের আদৌ বহন করার ক্ষমতা আছে কি না—সেই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। এই দাবা খেলায় চাল দেওয়া হয়ে গেছে। চেকমেটটা কে খায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।










