দুই বাঙালি, এক টস

সেদিনটা শুধু ক্রিকেটের ইতিহাসেই নয়, বাঙালির ইতিহাসেও অনন্য। নানা আয়োজন ছিল সেদিন, রথী-মহারথীদের ঠিকানা সেদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামি। প্রধানমন্ত্রী আসলেন, আকাশে বেলুন উড়লো। হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে সাদা পোশাকে সেদিন প্রথমবারের মত টস করতে নেমেছিলেন দুই বাঙালি – নাইমুর রহমান দুর্জয় ও সৌরভ গাঙ্গুলি। হৃদয় কাঁপানো, ভূবন ভোলানো এক দৃশ্য!

হেমন্তের মিষ্টি একটা সকাল। শীত আসি আসি করছিল। রোজকার নিয়মেই সকালে সেদিন ঘুম ভেঙেছিল নগরবাসীর। দিনটা শুক্রবার ছিল, অন্য যেকোনো উইকেন্ডের মতই প্রানচাঞ্চল্য একটু কম ছিল।

এটুকু শুনলে ২০ বছর আগের ঢাকা নগরীর সেই দিনটাকে স্বাভাবিক একটা শুক্রবার মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, না। আসলে মোটেও বাংলাদেশের জন্য কিংবা বাঙালি জাতির জন্য স্বাভাবিক কোনো দিন ছিল না।

সেদিন ছিল ‘আমাদের’ ইতিহাস গড়ার দিন। প্রথমবারের মত টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। ইতিহাসের দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে লেখা হয়ে যায় বাংলাদেশের নাম।

তবে, সেদিনটা শুধু ক্রিকেটের ইতিহাসেই নয়, বাঙালির ইতিহাসেও অনন্য। নানা আয়োজন ছিল সেদিন, রথী-মহারথীদের ঠিকানা সেদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামি। প্রধানমন্ত্রী আসলেন, আকাশে বেলুন উড়লো। হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে সাদা পোশাকে সেদিন প্রথমবারের মত টস করতে নেমেছিলেন দুই বাঙালি – নাইমুর রহমান দুর্জয় ও সৌরভ গাঙ্গুলি। হৃদয় কাঁপানো, ভূবন ভোলানো এক দৃশ্য!

নি:সন্দেহে দুর্জয়ের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময় টসে নামার সেই মুহূর্তটি। ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্সটাও তিনি সেই টেস্টেই পান। ভারতের প্রথম ইনিংসে ১৩২ রান দিয়ে ছয় উইকেট নেন এই অফস্পিনিং অলরাউন্ডার।

বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়কের ক্যারিয়ার অবশ্য এর পর আর খুব বেশি দূর লম্বা হয়নি। ২০০২ সালে তিনি সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। আট টেস্ট আর ২৯ টি ওয়ানডেতেই তিনি থেমে যান। বছর দুয়েক বাদে তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটও ছেড়ে দেন।

নাইমুর রহমান দুর্জয় এখন পুরোদস্তর রাজনীতিবিদ। তিনি মানিকগঞ্জ-১ আসনের সম্মানিত সংসদ সদস্য। এক সময়ের জাতীয় দলের নির্বাচক ছিলেন। এখন তিনি বোর্ডের পরিচালক ও হাই পারফরম্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান।

অন্যদিকে, সৌরভ গাঙ্গুলি যখন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে মাঠে নামেন, তখন তিনি ঠিক মহীরূহ হয়ে ওঠেননি। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের তোপে ভারতীয় ক্রিকেট যখন কাঁপছে – তখন তিনি আসেন অধিনায়ক হয়ে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই ম্যাচ দিয়েই টেস্টে প্রথমবারের মত নেন নেতার দায়িত্ব। কালক্রমে তিনি ভারতকে অজেয় একটা দলে পরিণত করে গেছেন। এনে দিয়েছেন অসংখ্য অবিস্মরণীয় জয়, অনন্য সব অর্জন। সবচেয়ে বেশি যেটা দিয়েছেন সেটা হল ‘সাহস’।

সেই সাহসে অদম্য হয়ে পরবর্তীতে ভারত আইসিসির সবগুলো শিরোপা জিতে ফেলে, টেস্টে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। হয়ে ওঠে ভয়ডরহীন ক্রিকেটের ধারক। সব কিছুর শুরুটা সেই ২০০০ সালেই হয়েছিল। সেই বছরই প্রথম সৌরভ ভারতকে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে নিয়ে যান।

ক্যারিয়ারের শেষটা বিতর্কিত ছিল প্রিন্স অব ক্যালকাতার। ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক হওয়ার পরও বিদায় বেলাটা আক্ষেপে ভরা ছিল সৌরভের।

তবে, ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে সৌরভ অবশ্য অবিসংবাদিত সর্বেসর্বা। তিনি এখন ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বোর্ড অব কনট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) সভাপতি। আর ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে তিনি নিজের মানটা চিনিয়েছেন ঐতিহাসিক গোলাপী বলের টেস্ট কিংবা করোনা ভাইরাসের প্রকোপ এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) আয়োজন করে।

বোঝাই যাচ্ছে, ২০০০ সালটা দু’জনের জন্য মাইলফলকের বছর ছিল, ছিল নিজেদের নতুন করে চেনার বছর। আর সেই বছরের ১০ নভেম্বর এসে কেবল এই দু’জনকেই নয় – গোটা বাঙালি জাতিকেই চিনে নেয় বিশ্ব!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...