বিস্তৃতি ক্রিকেট সংস্কৃতির ভারতে প্রতিবছরই নতুন কোন সম্ভাবনার উদয় হয়। বড় মঞ্চে ওঠার আগেই যাকে ঘিরে তৈরি হয় প্রত্যাশা, তুলনা আর আলোচনার বলয়। সে তালিকায় বৈভব সুরিয়াভানশি আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন সাম্প্রতিক সময়ে। বয়স এখনও ছুঁয়ে দেখেনি ১৫ বছরের গণ্ডি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ এখনো তার জন্য অচেনা, কিন্তু চাপ, লাইমলাইট আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস- এই তিনের সঙ্গে সে ইতিমধ্যেই মানিয়ে নিয়েছে।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে বৈভবের জন্য প্রথম ও সত্যিকারের বৈশ্বিক পরীক্ষা। সেই বৈশ্বিক আসরে তিনি চাপ সইতে পারেন কি-না তা দেখার আগ্রহ সকলের মাঝে। তিনি যে পাশ মার্ক পেয়ে যাবেন, সে বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে অবিচল মানসিক শক্তির কারণে। শৈশবের কোচ মানিশ ওঝা স্পষ্ট করেই তাই বলেছেন, ‘ও কখনোই চাপ নেয়নি। খুব ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটকে শুধু খেলা হিসেবেই দেখেছে।’
এই দৃষ্টিভঙ্গিই বৈভবের দ্রুত উত্থানের ভিত্তি। গত মৌসুমে আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে ৩৫ বলে শতরান করে ছেলেদের টি-টোয়েন্টিতে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে রেকর্ড গড়েন বৈভব। অনেক কিশোরের জন্য এমন ইনিংসই চূড়ান্ত প্রাপ্তি হয়ে ওঠে। বৈভবের ক্ষেত্রে তা ছিল কেবল শুরু।

আইপিএলের পর থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটে তার পারফরম্যান্স ধারাবাহিক। টি-টোয়েন্টিতে ১৮ ম্যাচে ৭০১ রান, লিস্ট-এ ক্রিকেটে আট ম্যাচে ৩৫৩ রান, প্রথম-শ্রেণিতে আট ম্যাচে ২০৭ রান। যুব টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে রয়েছে পাঁচটি শতক। ফরম্যাট বদলালেও তার ব্যাটিংয়ের ধারা বদলায়নি।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তার অ্যাপ্রোচ। বৈভব ইনিংস গড়া বা খেলাকে বড় করার অপেক্ষায় থাকেন না। শুরু থেকেই বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করেন। প্রতিপক্ষ ঠিকঠাক ম্যাচে মানসিকতা রপ্ত করারআগেই ম্যাচ নিজের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন বৈভব।
গত এক বছরে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও এই প্রবণতা ছিল স্পষ্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যুব ওয়ানডতে ১৫ বলে অর্ধশতক, পরের ম্যাচেই ৭৪ বলে ১২৭ রান। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৫০ বলে ৯৬- সংখ্যাগুলো শুধু রান নয়, এক স্পষ্ট বার্তা।

দলের ফলাফল তাই নির্ভর করে বৈভবের উপর। এ বিষয়ে তার কোচ ওঝা বলেন, এখন দল ওর ওপর নির্ভর করছে। ও শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্টার করে প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।’
এই আত্মবিশ্বাসের গোড়াপত্তন হয়েছে অনেক আগে। ২০২২ সালে পাটনায় তার থেকে বড় স্টেট ক্রিকেটারদের সঙ্গে একটি ম্যাচে মাত্র ১১ বছর বয়সেই ১১৮ রান করেন বৈভব। বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ বোলারদের বিপক্ষে ৭৫-৮০ মিটার ছক্কা তখনই আলাদা করে চোখে পড়ে।
ছোটবেলায় প্রতিদিন ৪০০-৫০০ বল খেলে অনুশীলন করেছেন বৈভব। তখন টেকনিকের ওপর বাড়তি জোর দেওয়া হত, বল খুব দূরে পাঠাতে পারতেন না। কিন্তু প্রক্রিয়াটা সঠিক ছিল বলে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একই শট এখন গ্যালারিতে পৌঁছাচ্ছে। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন, শক্ত ব্যাকলিফট আর একাগ্র অনুশীলন বৈভবকে সমবয়সীদের থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে বড় মুহূর্তে শান্ত থাকার ক্ষমতা।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ সেই বড় মুহূর্তগুলোরই মঞ্চ। বৈভব সুরিয়াভানশির ক্যারিয়ারের গতিপথ বলছে, তিনি এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত। রান আসছে, দায়িত্ব বাড়ছে, আস্থাও বাড়ছে। তবে তার কোচ দিয়ে রেখেছেন স্পষ্ট সতর্কবার্তা, ‘এই দেশে প্রতিভার অভাব নেই। শচীন টেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনি, কপিল দেব—এরা খুব কমই আসে। সে কাতারে যাওয়ার সুযোগটা কাজে লাগাতে হলে ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রত্যাশার ভারে নুয়ে পড়া নয়, বরং সেটাকে স্বাভাবিক ধরে এগিয়ে যাওয়া-সে পথেই হাঁটছেন বৈভব সুরিয়াভানশি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ তার জন্য পরীক্ষা। ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য, সে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি এক প্রতিভা।











