আজকের শান্ত, স্থিতধী এবং লড়াকু সুরিয়কুমার যাদবকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় মুম্বাই ক্রিকেটের ‘ব্যাড বয়’ তকমাটা লেগেছিল তার গায়ে। বাইশ গজে বোলারদের শাসন করার আগে তাকে লড়তে হয়েছে নিজের ভেতরের অস্থিরতার সাথে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে মুম্বাই ক্রিকেট দলের এই প্রতিভাকে ঘিরে ছিল একের পর এক বিতর্ক আর শৃঙ্খলাভঙ্গের কালো মেঘ।
২০১৪-১৫ মৌসুমের কথা। সুরিয়াকুমার তখন রঞ্জি ট্রফিতে মুম্বাই দলের কাণ্ডারি। কিন্তু মাঠের ফর্ম আর ড্রেসিংরুমের পরিবেশ – কোনোটাই যেন ছিল না তার পক্ষে। সতীর্থদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং আপত্তিকর বাক্য বিনিময়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয় যে, মৌসুমের মাঝপথেই অধিনায়কত্ব থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন তিনি।
একই বছর কর্পোরেট ট্রফির একটি ম্যাচে প্রত্যাশিত ব্যাটিং করতে না পেরে মেজাজ হারিয়ে বিকেসি ফেসিলিটির ড্রেসিংরুমের একটি কাঁচের দেয়াল ভেঙে ফেলেছিলেন তিনি। এই ঘটনাগুলো তার ক্রিকেটীয় সত্তার চেয়ে তার উদ্ধত আচরণকেই বেশি সামনে নিয়ে আসছিল।

২০১৬-১৭ মৌসুমে এক ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার পর এক সাংবাদিকের করা সমালোচনামূলক টুইট রিটুইট করেছিলেন তিনি। বিষয়টি এমসিএর নীতিমালার পরিপন্থী হওয়ায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং বাদ দেওয়া হয় বিজয় হাজারে ট্রফি থেকে।
২০১৬ সালের সেই মেঘাচ্ছন্ন দিনগুলোই ছিল সুরিয়াকুমারের জীবনের প্রকৃত সন্ধিক্ষণ। বারবার দল থেকে ছিটকে পড়া আর নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হওয়া তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সামনে। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, বোলারদের শাসন করার আগে শাসন করতে হবে নিজের অবাধ্য মনকে।
এরপর শুরু হয় এক নীরব বিপ্লব। এক অবিশ্বাস্য রূপান্তর। নিজের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে জীবনবোধ, সবখানেই আমূল পরিবর্তন আনেন সুরিয়া। সেই উদ্ধত- উচ্ছৃঙ্খল তরুণটি ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করতে শিখলেন। চঞ্চলতা বিসর্জন দিয়ে আলিঙ্গন করলেন হিমশীতল ধৈর্যকে।

মুম্বাই ক্রিকেটের সেই কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায় পেছনে ফেলে তিনি ডানা মেললেন আইপিএল আর ভারতের নীল জার্সির আঙিনায়। টি-টোয়েন্টিতে ভাঙলেন একের পর এক রেকর্ড। এই ফরম্যাটটায় নিজেকে নিয়ে গেছেন বিশ্বসেরা ব্যাটারের উচ্চতায়। অধিনায়কত্ব গ্রহণ করে পুরো সময়টা জুড়েই ভারতকেও ধরে রেখেছেন র্যাংকিং এর সবার উপরে।
আজ তিনি যখন বাইশ গজে দাঁড়ান, তখন ড্রেসিংরুমের সেই কাঁচ ভাঙার শব্দ শোনা যায় না, বরং শোনা যায় বোলারদের দম্ভ চূর্ণ হওয়ার আওয়াজ। সুরিয়াকুমারের আজকের এই আকাশছোঁয়া সাফল্য কেবল কবজির মোচড়ে নয়, বরং নিজের ভেতরের অন্ধকারকে জয় করার এক মহাকাব্যিক জয়গাথা।
ভারতের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক তকমা থেকে আর মাত্র দুইটি ম্যাচ দূরে সুরিয়া। প্রদীপ্ত সূর্যের মতো সব গ্লানি মুছে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন – পতনের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আসলে প্রকৃত নায়কের জন্ম হয়।











