ভয়ঙ্করতম ম্যাচ উইনিং ফাস্ট বোলার

নতুন বলে ওয়াকারের সেরা অস্ত্র ছিল আউটসুইঙ্গার। স্লিঙ্গি, রাউন্ড আর্ম অ্যাকশনের কারণে আউটসুইংটা তাঁর জন্য ছিল ন্যাচারাল। তবে নতুন বলে ইনসুইং করাতে পারতেন না তিনি। অন্যদিকে আরেক ‘ডব্লু’ ওয়াসিম আকরাম আবার উইকেটের দুপাশেই বলকে ইচ্ছেমত সুইং করাতে পারতেন। কিন্তু ওয়াকারকে অপেক্ষা করতে হত পুরনো বলের জন্য। কারণ এটাই ছিল তাঁর শক্তির জায়গা। পুরোনো বলে অফ স্টাম্পের বেশ খানিকটা বাইরে থেকে আচমকা ভেতরে ঢোকা ১৫০ কিলোমিটার গতির নিখুঁত ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কার বা লেট ইনডিপার দিয়ে স্টাম্প উপড়ে ফেলাকে রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন তিনি। অনেকের মতেই পুরোনো বলে ওয়াকারের চেয়ে বিধ্বংসী বোলার ইতিহাসে আর একজনও আসে নি।

নব্বই দশকের বিখ্যাত ফাস্ট বোলিং জুটি ‘টু ডব্লুজের’ কথা নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের। ‘ডব্লু’ আদ্যক্ষরে নাম হওয়ায় পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুসকে এক সাথে ডাকা হত ‘টু ডব্লুজ’। অনেকের মতে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচাইতে বিধ্বংসী এবং সফলতম পেস বোলিং জুটি হচ্ছে এই ‘টু ডব্লুজ’। নব্বই দশকের প্রায় পুরোটা জুড়েই যারা ক্রিকেট দুনিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।

ইমরান খানের বিদায়ের পর পাকিস্তানের পেস আক্রমণের দায়িত্বটা বলা যায় বেশ দক্ষ হাতেই সামলেছেন দুই ‘ডব্লু’। পরিসংখ্যান বলছে, ওয়াসিম-ওয়াকার মিলে জুটি বেঁধে ৫৬ টেস্টে শিকার করেছেন ৪৭৬ উইকেট; মাত্র ২২.৩ গড়।

‘টু ডব্লুজ’-এর অন্যতম সদস্য ওয়াকার ইউনুস ছিলেন বল হাতে একজন সত্যিকারের ম্যাচ উইনার। প্রায় নিশ্চিত হেরে যাওয়া অনেক ম্যাচও জিতিয়েছেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। বিশেষ করে ‘ডেথ ওভারে’ এবং ‘পুরনো বলে’ রিভার্স সুইংয়ে তাঁর মত স্কিলফুল বোলার খুব কমই এসেছে।

ওয়াকারের বিশেষত্ব ছিল দুরন্ত গতির সাথে নিখুঁত ইয়র্কার আর রিভার্স সুইং। প্রচন্ড গতিতে বল করতে পারতেন বলে ধারাভাষ্যকার চিশতী মুজাহিদ যার নাম দিয়েছিলেন ‘বুরেওয়ালা এক্সপ্রেস’। ওয়াসিম আকরামের বলে সুইং হয়ত অনেক বেশি ছিল, তবে গতিতে এগিয়ে ছিলেন ওয়াকারই। পুরনো বলে রিভার্স সুইংয়ে পারদর্শী ছিলেন দুজনই। তবে ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর’ বিবেচনায় রিভার্স সুইংয়ে ‘ভয়ঙ্করতম’ মানতে হবে ওয়াকারকেই। রিভার্স সুইংয়ে সফলতম বোলারও তিনিই। এজন্য তাঁকে ‘কিং অব রিভার্স সুইং’ও বলে থাকেন অনেকে।

প্রয়াত কোচ বব উলমারের ভাষায়, ‘Waqar had a unique technique of swinging the ball in the air at very high speed before hitting the ground. Others may have swung it more, but no one have swung it faster or with such destructive intent and deadly accuracy.’

ক্রিকেটে রিভার্স সুইংয়ের প্রচলন ঘটেছিল ইমরান খান, সরফরাজ নেওয়াজ, সিকান্দার বখতদের হাত ধরে। তবে এই শিল্পকে জনপ্রিয় করার পেছনে মূল কৃতিত্বটা দিতে হবে ওয়াসিম-ওয়াকারকেই।

ওয়াসিম-ওয়াকার দুজনেরই একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল ‘ব্যানানা সুইং’-এর। তীব্র গতির একটা বলকে বাতাসে বা শূন্যের ওপরে বাঁক খাওয়াতে পারতেন তাঁরা। যার গতিপথ ছিল অনেকটা ‘কলা’র আকৃতির। ধারাভাষ্যকাররা ক্রিকেটের অভিনব ও নান্দনিক এই শিল্পের নাম দিয়েছিলেন ‘ব্যানানা সুইং’। বিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে বোকা বানাতে অত্যন্ত কার্যকরী অস্ত্র এটি।

নতুন বলে ওয়াকারের সেরা অস্ত্র ছিল আউটসুইঙ্গার। স্লিঙ্গি, রাউন্ড আর্ম অ্যাকশনের কারণে আউটসুইংটা তাঁর জন্য ছিল ন্যাচারাল। তবে নতুন বলে ইনসুইং করাতে পারতেন না তিনি। অন্যদিকে আরেক ‘ডব্লু’ ওয়াসিম আকরাম আবার উইকেটের দুপাশেই বলকে ইচ্ছেমত সুইং করাতে পারতেন। কিন্তু ওয়াকারকে অপেক্ষা করতে হত পুরনো বলের জন্য। কারণ এটাই ছিল তাঁর শক্তির জায়গা। পুরোনো বলে অফ স্টাম্পের বেশ খানিকটা বাইরে থেকে আচমকা ভেতরে ঢোকা ১৫০ কিলোমিটার গতির নিখুঁত ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কার বা লেট ইনডিপার দিয়ে স্টাম্প উপড়ে ফেলাকে রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন তিনি। অনেকের মতেই পুরোনো বলে ওয়াকারের চেয়ে বিধ্বংসী বোলার ইতিহাসে আর একজনও আসে নি।

ধারাভাষ্যকার মাইক হেইসম্যানের ভাষায়, ‘The most dangerous, most lethal exponent of reverse swing I’ve ever seen would be Waqar Younis.’

ওয়াকার ইউনুসের জন্ম ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিহারিতে। তবে বাবার কর্মসূত্রে শৈশব কেটেছে দুবাইতে। ক্রিকেটের হাতেখড়িটাও সেখানেই। জেনে নিশ্চয়ই অবাক হবেন যে, ওয়াকারের শুরুটা হয়েছিল একজন লেগ স্পিনার হিসেবে! কিন্তু সতীর্থদের দেখাদেখি তিনিও একসময় পেসার হতে চাইলেন। মিডিয়াম পেসার নয়; ফাস্ট বোলার! লম্বা রানআপে তেড়েফুঁড়ে বল করার মাঝেই যেন তিনি খুঁজে পেলেন সত্যিকার ক্রিকেট-রোমাঞ্চের স্বাদ। গতির নেশাটা যে রীতিমতো পেয়ে বসেছিল তাকে!

ছেলেবেলা থেকেই ওয়াকার ছিলেন ন্যাচারাল বর্ন অ্যাথলেট, ন্যাচারাল স্প্রিন্টার। সাঁতার, হাই জাম্প, পোল ভল্টিং, জ্যাভলিন থ্রোসহ বিভিন্ন খেলায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। ফাস্ট বোলিং করার সময় তাঁর ছন্দোবদ্ধ ও লম্বা রানআপের রহস্যও ছিল এই অ্যাথলেটিসিজম।

তবে ছেলেবেলায় এক দুর্ঘটনায় তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারটাই পড়ে গিয়েছিল হুমকির মুখে। উঁচু ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে লাফ দিতে গিয়ে এমন মারাত্মক ইনজুরিতে পড়েছিলেন যে কেটে ফেলতে হয়েছিল বাঁহাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি।

ওয়াকারের ফার্স্ট ক্লাস অভিষেক মুলতানের হয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে। আন্তর্জাতিক অভিষেক তার এক বছর পরই। ইনজামাম উল হক, তৌসিফ আহমেদের মত ওয়াকারও ছিলেন ইমরান খানের আবিষ্কার। ১৯৮৯ সালের ঘটনা। পাকিস্তানের ঘরোয়া লিগের একটা ফাইনাল ম্যাচ সেসময় টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। ‘সৌভাগ্যক্রমে’ সেই ম্যাচটা দেখতে বসেছিলেন পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ইমরান খান। সেই ম্যাচেই সদ্য কৈশোর পেরোনো ওয়াকারের স্লিঙ্গি অ্যাকশনের গতিময় বোলিং দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে যান ইমরান। পরের দিনই সরাসরি চলে যান মাঠে, ওয়াকারকে গিয়ে বলেন, ‘আগামী মাসে তুমি ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে শারজায় যাচ্ছো।’

১৯৮৯ সালের অক্টোবরে শারজায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়াকারের ওয়ানডে অভিষেক। অভিষেকে দল জিতলেও ৪ ওভার বোলিং করে ১৪ রান দিয়ে ওয়াকার ছিলেন উইকেটশূন্য। আর ৩৮ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ওয়াসিম আকরাম হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। তবে পরের ম্যাচে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৯ ওভারে মাত্র ২৮ রানের বিনিময়ে তিন উইকেট নিয়ে দলের পক্ষে সফলতম বোলার ছিলেন এই ওয়াকারই।

১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর, করাচিতে ভারতের বিপক্ষে ওয়াকারের স্বপ্নের টেস্ট অভিষেক। মজার ব্যাপার হল, ওটা ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ‘বিস্ময়বালক’ শচীন টেন্ডুলকারেরও অভিষেক টেস্ট। দুই ডেব্যুট্যান্টের দ্বৈরথটাও ছিল দেখার মত। ইনিংসের শুরুতেই দ্রুতগতির এক বাউন্সারে শচীনের নাক ফাটিয়ে দেন ওয়াকার। ব্যক্তিগত ১৫ রানের মাথায় শচীনকে সরাসরি বোল্ড করে প্যাভিলিয়নের রাস্তাটাও দেখিয়েছিলেন তিনিই।

অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ওয়াকারের শিকার ছিল চার উইকেট। তাঁর বলে আউট হওয়া ব্যাটসম্যানরা ছিলেন যথাক্রমে সঞ্জয় মাঞ্জরেকার, শচীন টেন্ডুলকার, মনোজ প্রভাকর ও কপিল দেব। তবে ইনজুরির কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে নেননি তিনি।

১৯৯০ সালের এপ্রিলে শারজায় অনুষ্ঠিত পাঁচজাতি টুর্নামেন্ট ‘অস্ট্রেলেশিয়া কাপ’-এর সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলার ছিলেন ওয়াকার ইউনুস। চার ম্যাচ খেলে মাত্র ৭.৪১ গড়ে নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট! ভারত (৪/৪২), শ্রীলংকা (৬/২৬) ও নিউজিল্যান্ডের (৫/২০) বিপক্ষে টানা তিন ম্যাচে জিতে নেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার! ওয়ানডে ইতিহাসের কনিষ্ঠতম বোলার হিসেবে পাঁচ উইকেট শিকারের রেকর্ডটি আজও ওয়াকার ইউনুসের দখলে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৬ রানে ৬ উইকেট (চারটি বোল্ড, দুটি এলবিডব্লিউ) শিকারের দিন তাঁর বয়স হয়েছিল ১৮ বছর ১৬৪ দিন!

১৯৯০ সালে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন ওয়াকার। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজটা পাকিস্তান জিতেছিল ৩-০ ব্যবধানে। সিরিজ সেরা ওয়াকার নিয়েছিলেন ২৯ উইকেট, মাত্র ১০.৮৬ গড়ে! টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা; তাও টানা দুই ম্যাচে! লাহোর টেস্টে ১০ উইকেটের পর ফয়সালাবাদ টেস্টে নিয়েছিলেন ১২ উইকেট।

টেস্ট সিরিজে বল হাতে পাওয়া সাফল্যের ধারাবাহিকতাটা ধরে রেখেছিলেন ওয়ানডে সিরিজেও। তিন ম্যাচে ১১ উইকেট নেন ‘অবিশ্বাস্য’ ৪.৮২ গড়ে! ফর্মের তুঙ্গে থাকা ওয়াকারের সামনে ন্যূনতম প্রতিরোধটুকুও গড়তে পারেনি ব্ল্যাকক্যাপরা।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ দুই ম্যাচ (৫/১১ ও ৫/১৬) ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরবর্তী সিরিজের প্রথম ম্যাচ (৫/৫২) অর্থাৎ টানা তিন ওয়ানডেতে ৫ উইকেট শিকারের অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছিলেন ওয়াকার ইউনুস। ওয়ানডে ইতিহাসের একমাত্র বোলার হিসেবে যে কীর্তির অংশীদার কেবল তিনি একাই। ওয়ানডে ইতিহাসে টানা দুই ম্যাচে ৫ উইকেট পাওয়ার ঘটনা আছে মাত্র ১২ টি। যার তিনটিই ঘটিয়েছেন ওয়াকার ইউনুস!

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মত কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন ওয়াকার; এবং প্রথম মৌসুমেই তিনি বাজিমাত করেছিলেন সারের হয়ে। মাত্র ১৪.৬৫ গড়ে তুলে নিয়েছিলেন ১১৩ টি উইকেট! অভাবনীয় এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জিতে নেন ১৯৯২ সালের উইজডেন বর্ষসেরার পুরস্কার।

পরের বছর পাকিস্তান দলের সাথে আবারও ইংল্যান্ড সফরে যান ওয়াকার। পাকিস্তান সেবার টেস্ট সিরিজ জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। ‘যুগ্মভাবে’ নির্বাচিত সিরিজ সেরা ওয়াকারের ঝুলিতে জমা পড়েছিল সিরিজ সর্বোচ্চ ২২ উইকেট। এছাড়া আরেক ‘সিরিজ সেরা’ ওয়াসিম আকরাম নিয়েছিলেন ২১ উইকেট।

১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডারবানের কিংসমিডে ওয়াকারের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ২০৮ রানের মামুলি পুঁজি ডিফেন্ড করে জিতেছিল পাকিস্তান। ২০৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে এক পর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ছিল ১ উইকেটে ১৫৯ রান। ওপেনার এন্ড্রু হাডসনকে (৯৩) বোল্ড করে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনাটা হয়েছিল ওয়াকারের হাত ধরেই। শেষ পর্যন্ত ১৯৮ রানে অলআউট হয় তারা। ১০ ওভার বোলিং করে মাত্র ২৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন ওয়াকার। যার সবগুলোই এসেছিল পুরনো বলের বিধ্বংসী এক স্পেলে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, প্রতিটি আউটই ছিল ক্লিন বোল্ড!

একই বছর ডিসেম্বরে মাত্র ২২ বছর বয়সে নিয়মিত অধিনায়ক ওয়াসিম আকরামের অনুপস্থিতিতে ওয়াকার পেয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করাচি টেস্টে ‘অধিনায়ক’ ওয়াকার নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট; হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা। শুধু তাই নয়, তিন ম্যাচের সিরিজে মাত্র ১৩.৮ গড়ে ২৭ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরার পুরস্কারটাও বাগিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৯১-১৯৯৩ এই তিন বছরে টেস্টে মাত্র ১৮ গড়ে ওয়াকারের শিকার ছিল ১০৯ উইকেট।

১৯৯৪ সালের মার্চে অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে ওয়াকারের ‘হ্যাটট্রিক’সহ ৬ উইকেটের সৌজন্যে কিউইদের বিপক্ষে নিশ্চিত হারতে বসা ম্যাচ শেষ পর্যন্ত ‘টাই’ করেছিল পাকিস্তান। মজার ব্যাপার হল, হ্যাটট্রিকের তিন আউটের সবগুলোই ছিল বোল্ড!

১৬২ রানের সহজ টার্গেট তাড়া করতে নেমে এক পর্যায়ে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ১৪২ রান। কিন্তু ওয়াকারের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ১৯ রানে শেষ ৬ উইকেট হারায় ব্ল্যাক ক্যাপসরা। ফলাফল ম্যাচ টাই!

১৯৯৭ মৌসুমে গ্ল্যামারগনকে ইংলিশ কাউন্টির শিরোপা জেতাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন ওয়াকার ইউনুস। সাসেক্স এবং ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ‘মহাগুরুত্বপূর্ণ’ শেষ দুই ম্যাচে মাত্র ৪২ রান খরচায় তিনি নিয়েছিলেন ১৫ উইকেট! সাসেক্সের বিপক্ষে মাত্র ১৭ রানে ৮ উইকেট শিকারের ঠিক পরের ইনিংসেই ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ‘হ্যাটট্রিক’সহ ৭ উইকেট নেন ২৫ রানের বিনিময়ে!

২০০০ সালে শারজাহর সেই বিখ্যাত ফাইনালের কথা মনে আছে আপনাদের? প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান করেছিল ২৬৩ রান। জবাবে শুরুতেই মাত্র ৩০ রানে গিবস আর ক্যালিসের মূল্যবান দুটি উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু ম্যাকেঞ্জিকে (৫৮) নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ে (৭৯)। এই দুজনের বিদায়ের পরেও বাউচার, ক্লুজনার, পোলকরা ছিলেন। কিন্তু শেষ হাসিটা হেসেছিলেন ওয়াকার ইউনুস! প্রথম স্পেলে বেধড়ক মার খাওয়ার পরেও যিনি দ্বিতীয় স্পেলে জ্বলে ওঠেন অবিশ্বাস্যভাবে।

‘রিভার্স সুইং’ বোলিংয়ের এক ভয়াল প্রদর্শনী দেখিয়ে এক স্পেলে তুলে নেন চার-চারটি উইকেট। একে একে তিনি প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান নিকি বোয়ে (০), ল্যান্স ক্লুজনার (০), শন পোলক (১৪) আর ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠা মার্ক বাউচারকে (৫৭)। বোলারদের নৈপুণ্যে প্রায় নিশ্চিত হাতছাড়া হতে যাওয়া ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১৭ রানে জিতে নেয় পাকিস্তান। আর খরুচে বোলিং করেও ৪ উইকেট (৪/৬২) নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কারটা ওঠে ওয়াকার ইউনুসের হাতে। শুধু তাই নয়, ৫ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরাও হয়েছিলেন ‘বুরেওয়ালা এক্সপ্রেস’।

ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশিবার ৫ উইকেট এবং ৪ উইকেট পাওয়া বোলার হলেন ওয়াকার ইউনুস। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ১৩ বার ৫ উইকেট এবং ‘রেকর্ডসংখ্যক’ ২৭ বার ৪ উইকেট লাভের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। ভাবছেন এ আর এমন কী! ওয়াকারের কীর্তির মাহাত্ম্যটা বোঝা যায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা মুরালিধরনের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। ওয়ানডেতে ১০ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিতে মুরালির লেগেছে ৩৫০ ম্যাচ। সেখানে ১৩ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিতে ওয়াকারের লেগেছে মাত্র ২৬২ ম্যাচ!

এবারে ওয়াকার ইউনুসের ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

  • টেস্ট

ম্যাচ- ৮৭, উইকেট- ৩৭৩, গড়- ২৩.৫৬, স্ট্রাইক রেট- ৪৩.৪, ৫ উইকেট- ২২ বার, ১০ উইকেট- ৫ বার, সেরা বোলিং- ৭/৭৬

  • ওয়ানডে

ম্যাচ- ২৬২, উইকেট- ৪১৬, গড়- ২৩.৮৪, স্ট্রাইক রেট- ৩০.৫, ৫ উইকেট- ১৩ বার, ৪ উইকেট- ২৭ বার, সেরা বোলিং- ৭/৩৬

পাকিস্তানকে সর্বমোট ১৭ টি টেস্ট আর ৬২ টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওয়াকার ইউনুস। টেস্টে ৭ টি হারের বিপরীতে জয় ১০ টি আর ওয়ানডেতে ২৩ টি হারের বিপরীতে জয় পেয়েছেন ৩৭ টিতে। অধিনায়ক হিসেবে ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা বোলিংয়ের কীর্তিটাও ওয়াকার ইউনুসের। ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লিডসে মাত্র ৩৬ রানে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট।

ওয়ানডের সর্বকালের শীর্ষ উইকেটশিকারির তালিকায় এখনও পর্যন্ত ওয়াকার আছেন তিন নম্বরে। মুত্তিয়া মুরালিধরন (৫৩৪) এবং ওয়াসিম আকরাম (৫০২) তাঁকে ছাড়িয়ে গেলেও ওয়ানডের দ্রুততম ৪০০ উইকেট দখলের রেকর্ডটা এখনো তাঁর দখলে।

টেস্ট ক্রিকেটে কমপক্ষে ২০০ উইকেট পাওয়া বোলারদের মধ্যে একমাত্র ডেল স্টেইনের (৪২.৩) স্ট্রাইক রেটই ওয়াকারের (৪৩.৪) চেয়ে ভাল। বোলিং স্ট্রাইক রেটের এ পরিসংখ্যানই বলে দেয় কতটা নিপুণ উইকেটশিকারি ছিলেন তিনি।

একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, ওয়াকারের অধিকাংশ উইকেটই এসেছে বোল্ড আর লেগ বিফোরে। টেস্ট ক্যারিয়ারের ৫৬.৮% এবং ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৩.৯% উইকেট তিনি পেয়েছেন একক নৈপুণ্যে অর্থাৎ কোন ফিল্ডারের সাহায্য ছাড়া সরাসরি বোল্ড কিংবা এলবিডব্লুর মাধ্যমে।

ওয়াকার ইউনুসের সফল ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় আক্ষেপের নাম সম্ভবত বিশ্বকাপ। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সত্ত্বেও ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হতে পারেন নি কেবলমাত্র ইনজুরির কাছে হার মেনে। ঘরের মাঠে আয়োজিত ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ১৩ উইকেট পেলেও ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যায় তাঁর দল।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে শোয়েব আখতার, আব্দুল রাজ্জাকদের উত্থানের কারণে মূল একাদশে ঢোকারই সুযোগ পান নি; একটিমাত্র ম্যাচ খেলেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে যেটাতে হেরে গিয়েছিল পাকিস্তান। আর ২০০৩ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে যায় ওয়াকারের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান। ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটাও তিনি খেলে ফেলেন বিশ্বকাপেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...