আইপিএল ২০১৮, নিলামের দামামা বাজছে। নাইট রাইডার্সের স্কাউটিং টিমের খাতায় তখন এক নতুন নাম—বরুন চক্রবর্তী। এক রহস্যময় স্পিনার, যিনি নেটে নারাইন-কুলদীপদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বোলিং করেছেন, যাঁকে অধিনায়ক দীনেশ কার্তিকের চোখে মনে ধরেছে। কিন্তু বিধি বাম। পাঞ্জাব নিলাম যুদ্ধে কেকেআরকে হারিয়ে ছিনিয়ে নিল এই তরুণকে।
প্রথম ওভারেই প্রতিপক্ষ কেকেআর! প্রথম বলের সামনে তাঁরই আইডল, সুনীল নারাইন। নারাইন তাঁকে বুঝতে পারেননি, কিংবা হয়তো খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন। ব্যাট ঘুরল, বল উড়ে গেল বাউন্ডারির ওপারে। বরুণের আত্মবিশ্বাসে প্রথম ধাক্কা। দ্বিতীয় ওভার, নীতিশ রানাকে আউট করে লড়াই করলেন, কিন্তু প্রথম ওভারের সেই ধাক্কায় হারিয়ে গেলেন। পরের ম্যাচে চোট পেলেন, পুরো মৌসুম শেষ। পরের নিলামের আগেই তাঁকে ছেড়ে দিল পাঞ্জাব।
সবাই বলল, এ তো আরেক কারাপাক জিয়াস, যে আজকাল বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার নেটে বোলিং করে বেড়ায়। কিন্তু, নাইট রাইডার্স ভোলে না। তাঁরা, প্রতিভাকে একবার দেখে ফেললে বিশ্বাস হারায় না। ২০১৯-এ বরুণ ফিরলেন কেকেআরে। বাকিটা? ইতিহাস নাকি রহস্য?

বরুণ, একজন পুরোদস্তর আর্কিটেক্ট থেকে রহস্য স্পিনারের পথে হাঁটতে শুরু করলেন। অফ স্পিনের সঙ্গে লেগ স্পিনের মিশেল, হাত ঘোরানোর ভঙ্গিতে টুইস্ট, ক্রস-সিম লেগব্রেক, গুগলি, ক্যারম বল—সব মিলিয়ে যেন এক যাদুর বাক্স। ২০২০-২১ আইপিএলে তিনি বিপজ্জনক হয়ে উঠলেন, কিন্তু ততদিনে ব্যাটাররা তাঁকে বুঝতে শিখেছে। চেন্নাইয়ের ব্যাটাররা সহজেই তাঁকে খেলল, শ্রেয়স আইয়ার তাঁকে চোখ বন্ধ করে মারলেন। এভাবে চলবে না। বরুণ বুঝলেন, বদল আনতেই হবে।
২০২২ থেকে শুরু হলো তাঁর বিবর্তন। এবার মিশন লেগব্রেক! ক্রস-সিম থেকে সোজা সিম, আরও ধারালো গ্রিপ। কিন্তু, কাঁধের পুরনো চোট মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আগের মতো জোর নেই, রান আপের গতি কমে গেল। ২০২২ আইপিএল তাঁর জন্য দু:স্বপ্ন।
এই দু:স্বপ্ন থেকে তাঁকে জাগালেন অভিষেক নায়ার। বরুণ বুঝলেন, শরীরের নিচের অংশের শক্তি বাড়াতে হবে, রান আপে গতি আনতে হবে। ২০২৩-এ নতুন বরুন ফিরে এলেন। এবার তাঁর অস্ত্রাগারে যোগ হতে থাকল নতুন সব অস্ত্র। বল আচমকা পড়ে ড্রপ নিল, পিচের ঘর্ষণে অতিরিক্ত টার্ন পেল। ব্যাটারের ব্যাটে লাগলেও টাইমিং বিগড়ে যেতে লাগল। ফলাফল? ২০২৩ আইপিএলে ২০ উইকেট!

কিন্তু জাতীয় দলে ডাক আসার আগেই খবর — বরুণ আনফিট! চোট লুকিয়ে খেলেছেন! সব গুঞ্জন উড়িয়ে বরুণ বললেন, আমি সম্পূর্ণ ফিট! কিন্তু, ক্রিকেট এমনই নিষ্ঠুর — একবার সন্দেহ জন্মালে তা সহজে মুছে যায় না। একটা পেইড পিআর টিম নেই বলে বরুণ আক্ষেপও করলেন।
২০২৪, কেকেআরে ফিরলেন স্পিন কোচ কার্ল ক্রো। নারাইনের বদলে যাওয়া অ্যাকশন কিংবা কুলদ্বীপের বায়োমেকানিকস যিনি নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন, সেই ক্রো এবার বরুণের পাশে। বরুণ নিজেও নিজেকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করলেন। ভিডিও অ্যানালাইসিস করলেন, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজতে লাগলেন।
প্রথম কয়েকটা ম্যাচ যাচ্ছেতাই গেল। অতিরিক্ত হার্ড লেংথে বল করতে গিয়ে শট খেলতে দিলেন, রান লিক করলেন। কিন্তু তারপরই এল পরিবর্তন — এবার ড্রিফট আনলেন। গুগলি-লেগব্রেকের সঙ্গে এবার সাইড স্পিন মিশিয়ে ফেললেন। ব্যাটাররা বুঝতে পারল না, বল কোথায় পড়বে, কতটা ঘুরবে। ওভারস্পিন তাঁর লেগব্রেককে ভয়ঙ্কর করে তুলল, আর তাঁর গুগলি হয়ে উঠল এক অব্যর্থ অস্ত্র।

বরুণ এখন কেবল একজন মিস্ট্রি স্পিনার নন, তিনি একজন ফাইটার। ওডিআই ফরম্যাটেও তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন — ওভারের ছয়টি বলের প্রতিটি নতুন পরিকল্পনায় সাজাচ্ছেন। নতুন ডেলিভারি, নতুন কৌশল, নতুন রহস্য।
কে বলে, রহস্য স্পিনার আজ আর চলে না! সবাই কি আর অজন্থা মেন্ডিস! বরুণ চক্রবর্তী রহস্যকেই নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছেন। প্রবীণ তাম্বের মতোই, তিনি প্রমাণ করছেন বয়স কোনো বাঁধা নয়। নিয়তি যতই চোরাগলিতে ঢুকিয়ে দিক, জেদ থাকলে, মনোবল থাকলে, লড়াইটা জিতেই নেওয়া যায়। দেখালেন বরুণ।
বরুন চক্রবর্তী, একজন আর্কিটেক্ট, একজন রহস্য, এক যোদ্ধা। ক্রিকেটের নকশা তিনিই আঁকছেন, প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলছেন নিজের জাদুতে। তাঁর গল্প এখনো শেষ হয়নি, বরং প্রতি ম্যাচেই নতুন করে লেখা হচ্ছে। রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে বরুণের হাতে, তাঁর স্পিনে, তাঁর অদম্য সংকল্পে!











