মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কারখানার শ্রমিক হয়েও লেখা যায় রুপকথা। একটা বিস্ময়ের ঘোর লাগা দুনিয়া সৃষ্টি করা যায় চাইলেই। হওয়া যায় চ্যাম্পিয়ন। না, এগুলো কোন সিনেমার প্লট নয়- এসব কিছু করে দেখিয়েছেন ইংলিশ ফুটবলার জেমি ভার্ডি। গল্পটা তবে শুরু করা যাক?
জেমি ভার্ডির বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। শরীরের গঢ়নে আরও খানিকটা ছোট লাগে তাকে। ছেলেবেলা থেকেই প্রবল ইচ্ছে তার, তিনি হবেন ফুটবলার। কিন্তু শেফিল্ড ওয়েডনেসডে নামক ক্লাব তাদের যুব দল থেকে রীতিমত ছাটাই করে জেমি ভার্ডি। কারণ দর্শানো হয়- তার শারীরিক গঢ়ন অত্যন্ত ছোট।
যে বয়সে আজ লামিন ইয়ামাল বিশ্বকে বিস্ময়ে মাতিয়ে রেখেছেন, সেই বয়সে জেমি ভার্ডি নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগটুকুও পাচ্ছিলেন না। অথচ, তার জন্ম কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে জমজমাট দেশ ইংল্যান্ডে। তবে অদম্য জেমি ভার্ডি, তাতে দমে গেলেন না। ফুটবলের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কোন ক্লাবের সাথে সংযুক্তি নেই, তবুও তিনি দমে গেলেন না।

তিনি তখন থেকে নাম না জানা, বিভিন্ন অপেশাদার ক্লাবের হয়ে খেলতে থাকেন। ইংল্যান্ডের মূল ধারার ফুটবলের সাথে সম্পৃক্ত না এমন সব ক্লাবে নিজেকে তৈরি করেছেন একটু একটু করে। কিন্তু অপেশাদার ফুটবল খেলে তো আর হাতখরচ কিংবা সংসার চলে না।
তাইতো স্বপ্নের সাথে সমঝোতা করে জেমি ভার্ডি বনে গেলেন কারখানার শ্রমিক। শেফিল্ডের স্থানীয় এক চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে শুরু করেন জেমি ভার্ডি। তখনও বুকের মধ্যখানে পরম যত্নে লালন করে রেখেছিলেন ফুটবলার হওয়ার এক অবাস্তব স্বপ্ন।
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটনি শেষে তিনি ঠিকই ছুটে গেছেন পাশের কোন এক ফুটবল মাঠে। কখনো নিজে নিজে অনুশীলন করেছেন। কখনো বা ক্লাবের হয়ে ম্যাচ খেলেছেন। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তার দিন। হাতে ছিল না কোন পেশাদার চুক্তি, কিন্তু বুকে আছে স্বপ্ন আর প্রবল ইচ্ছেশক্তি।

এদিকে তো বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। ২৫ বছর বয়সেও তিনি ফ্লিটউড নামক ক্লাবের হয়ে খেলে বেড়াচ্ছেন। হয়ত মাঝেমধ্যেই হতাশ হয়ে পার্কের ধারের বেঞ্চে এক সমুদ্র সমান ক্লান্তি নিয়ে বসেছেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তার এই অধ্যাবসায় সৃষ্টিকর্তার কাছে ফেলনা মনে হয়নি। তাইতো লেস্টার সিটি হাত বাড়িয়ে ডেকে নিল জেমি ভার্ডিকে।
কোন লিগে না খেলা একটা ক্লাব থেকে রেকর্ড এক মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে জেমি ভার্ডিকে দলে নেয় লেস্টার। সেসময় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের ফুটবল লিগে অবস্থান করছিল লেস্টার সিটি। তারা রীতিমত একটা জুয়া খেলেছিল জেমি ভার্ডির উপর। আর বছর চারেক বাদে সেই জুয়াই তাদেরকে দিয়েছে সবচেয়ে বড় রিটার্ন।
ভার্ডির জন্যে রুপকথা কিন্তু স্রেফ ততটুকুই হতে পারত। তার হাতে ছিল পেশাদার চুক্তি। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের ফুটবলে তিনি খেলছেন- এ আর কম কি! তবে ওই যে শুরুতেই বললাম, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। ভার্ডি তার রুপকথা লেখা থামালেন না। তার অসাধারণ গোল স্কোরিং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে লেস্টার সিটিকে তুললেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মঞ্চে।

সেটুকুও বা যথেষ্ট কি করে হয়! ভার্ডি নামলেন এবার মিশনে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ তিনি চেখে দেখবেন যে করেই হোক। তার দুর্দমনীয় ইচ্ছে শক্তির কাছে তো সবকিছুই হার মেনেছে এক এক করে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পরাশক্তিদের নাকের ডগা থেকে শিরোপাটা রীতিমত ছোঁ মেরে নিয়ে গেলেন জেমি ভার্ডি।
লেস্টার সিটি কখনোই দাপুটে কোন ক্লাব ছিল না। কিন্তু এক জেমি ভার্ডি সেই দলটাকে নিয়ে ইতিহাস রচনা করলেন। ক্লাবটির ইতিহাসের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতালেন তিনি। হ্যা, সেই জেমি ভার্ডি জিতিয়েছেন যিনি ২৫ বছর অবধি যিনি ছিলেন এক স্বপ্নবাজ তরুণ।
২০১৫/১৬ মৌসুমে ভার্ডি একাই করেছিলেন ২৪টি গোল। এর মধ্যে টানা ১১টি ম্যাচে তিনি নিদেনপক্ষে একটি করে গোল করেছেন লেস্টার সিটির জার্সি গায়ে। রুড ভ্যান নিস্টলরয়ের রেকর্ডে ভেঙে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসেও জায়াগা করে নেন তিনি।

ফুটবল ময়দানে একদিন অমরত্ব লাভ করবেন বলেই তিনি প্রতিদিন লড়াই করেছেন। ক্লান্তির সাথে, বঞ্চনার সাথে, ব্যর্থতার সাথে সংগ্রাম করেই আজ লেস্টার সিটির ইতিহাসে চির অমলিন এক চরিত্র বনে গেছেন জেমি ভার্ডি। এটাই তো সিনেমা, জীবনটাই তো সিনেমা, দ্য অ্যাবসুলুট সিনেমা!











