ফল বিক্রেতা থেকে ক্রিকেটার, হায়দার আলীর এই দীর্ঘ যাত্রা পথের একমাত্র সঙ্গী ছিল স্বপ্ন। যে স্বপ্নের হাত ধরে তিনি আজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জার্সি গায়ে নির্ভরতার এক নাম।
পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এক গ্রাম কামালিয়া আজমত শাহ। যেখানে ছিলো না খেলার মতো মাঠ, ছিল না ক্রিকেটের কোনরকম সুযোগ-সুবিধা। পরিবার থেকেও উৎসাহের চেয়ে বাঁধাই ছিল বেশি।
মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে হায়দার পাড়ি জমান লাহোরে। হাতে সামান্য কিছু টাকা, কিন্তু চোখে ছিল বড় স্বপ্ন। লাহোরে লুধিয়ানা জিমখানা ক্লাবে জায়গা পান। দিনের আলোয় অনুশীলন করতেন , রাতে জীবিকার জন্য কাজ করতেন ওয়েটার হিসেবে। পরিবার তখনো জানতো না, তাঁদের ছেলে কী সংগ্রাম করে বেঁচে আছে!
এর মাঝেই এলো কোভিড। বন্ধ হয়ে গেল বিয়ে বাড়ির হল, হারিয়ে গেল ওয়েটারের কাজ। কিন্তু থেমে যাননি হায়দার। পেট চালাতে শুরু করলেন ফল বিক্রি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছর পার করেও ফলের ঠেলাগাড়িতে কেটেছে জীবনের মূল্যবান সময়। তবে ক্রিকেট থেকে একদিনও দূরে যাননি।

এরপর আসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। একটি অটো উল্টে ব্রিজ থেকে পড়ে যায় প্রায় ৩০ ফুট নিচে। গুরুতর চোট পান কাঁধে, পায়ে, নাকে। অনেকেই বলেছিলেন—এত চোটে ক্রিকেটে ফেরা অসম্ভব। কিন্তু হায়দার কখনো বিশ্বাস হারাননি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও শুধু একটাই কথা ভাবতেন— ‘আমি ফিরব, ব্যাট বল হাতে নিশ্চয়ই ফিরব।’
এরপর সিদ্ধান্ত নেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার। যাওয়ার আগে পরিবারকে বলেছিলেন— ‘আমি ফিরব, তোমাদের জন্য গর্ব হয়েই ফিরব।’ আমিরাতে শুরুটা হয় সেভেন ডিস্ট্রিক্টস ক্লাব দিয়ে।
এখন তিনি খেলেন কারওয়ান ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে। প্রতিদিন ভোর সাড়ে তিনটায় শুরু হতো তাঁর রুটিন। দিনের তীব্র গরমে, ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও চলে মাঠে অনুশীলন। সাঁতার, প্র্যাকটিস, জিম—ঘর্মাক্ত শরীর আর পুড়ে যাওয়া চামড়া যেন সাক্ষ্য দেয়, এই মানুষটি স্বপ্নকে কখনো ফিকে হতে দেননি। ।
২১ মে ২০২৫—এই দিনটিই যেন প্রমাণ করে দেয়, পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। বাংলাদেশকে হারিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত পেল তাদের ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয় কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে চার ওভার বল করে সাত রান দিয়ে হায়দার আলী তুলে নেন ৩ উইকেট।

যে ছেলেটি একসময় লাহোরের গলিতে গলিতে ওয়েটার ছিল, ঠেলাগাড়িতে করে ফল বিক্রি করত, সেই ছেলেই আজ সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্রিকেট দলের একজন নির্ভরযোগ্য স্পিনার। হায়দার আলি প্রমাণ করে দিয়েছেন, জীবনে কতবার হোচট খেলে তা মূখ্য বিষয় নয় , বরং প্রতিবার কিভাবে উঠে দাঁড়ানো যায়, সেটিই বড় কথা।











