মেহেদী হাসান মিরাজ কি আদৌ ওয়ানডে অধিনায়কত্বের জন্য প্রস্তুত? প্রশ্নটা এখন জোরেশোরেই ঘুরছে ক্রিকেট মহলে। কারণ, যে ক্রিকেটার নিজেই একাদশে অটোচয়েজ নন, তার হাতে পুরো দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া কতটা যৌক্তিক—সেই বিতর্কই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যর্থ সিরিজের পর সমালোচনার তীর ছুটেছে বিসিবির সিদ্ধান্তের দিকেই।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ইনজুরির কারণে লিটন দাসের অনুপস্থিতি ভুগিয়েছে বাংলাদেশ দলকে। ব্যাটিং অর্ডারে যেমন শূন্যতা ছিল, অভিজ্ঞতার ঘাটতিও স্পষ্ট। টি-টোয়েন্টিতে মিডল অর্ডার কোনোভাবে টেনে নিয়ে গেলেও, ওয়ানডেতে সেই ঘাটতি ধরা দিয়েছে প্রকটভাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ওয়ানডে দল এক পরিবর্তনের সময় পার করছে। অধিনায়ক পরিবর্তন ঘটছে ঘনঘন, মিডল অর্ডারে সিনিয়রদের অবসরে তৈরি হয়েছে বিশাল শূন্যতা। নির্বাচকেরা নতুনদের সুযোগ দিচ্ছেন, কিন্তু হৃদয়, তানজিদ তামিমদের মতো তরুণরা এখনও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। অন্যদিকে, মিরাজ, শান্ত, সোহানদেরও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিক সাফল্য মিলছে না।

ব্যাটিং ব্যর্থতার এই সময়টিতে বোলারদের তেমন সমালোচনা হয়নি, কারণ তারা তুলনামূলকভাবে ভালো করছে। কিন্তু ব্যাটিং লাইন ভেঙে পড়ছে বারবার—টপঅর্ডারের নড়বড়ে পারফরম্যান্সের সঙ্গে মিডল অর্ডারের ভঙ্গুরতা মিলিয়ে দলে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাটিং দুর্যোগ।
মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ-সাকিবদের বিদায়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে পারেননি কেউই। হ্যাঁ, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ কিংবা সাকিব বাংলাদেশকে কোনো ট্রফি এনে দিতে পারেননি, তবে পারফরম্যান্সের স্ট্যাবিলিটিতে এখনকার চেয়ে ওই বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল।
অধিনায়কত্বের অস্থিরতাও যোগ হয়েছে এই সমস্যায়। শান্তকে সরিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজকে অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। কারণ, মিরাজ যদিও গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার, ওয়ানডে ফরম্যাটে এমন দাপট দেখাতে পারেননি যে নেতৃত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া যায়। অনেকে মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে মিরাজের একাদশে জায়গা নিশ্চিত করার কৌশল কাজ করেছে।

স্পিন অলরাউন্ডার হিসেবে তার বিকল্প দলে আছে, আর ব্যাটসম্যান হিসেবে মিডল অর্ডারের ভার সামলানোর সামর্থ্য এখনও গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক ইনিংসগুলোতে তার রান এলেও সেগুলো দলের জয়ে প্রভাব ফেলছে না। ফলে দারুণ প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারকে নিয়ে বিতর্ক বাড়ছেই।
২০২৩ বিশ্বকাপে চান্দিকা হাতুরুসিংহের সিদ্ধান্তেই মিরাজকে টপ অর্ডারে খেলানো হয়েছিল—যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল পুরো দলে। এখন আবার তাকে অধিনায়ক করা হয়েছে, যা অনেকের মতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি। শান্তকে সরিয়ে মিরাজকে দায়িত্ব দেওয়ায় ওয়ানডে দলের পাশাপাশি টেস্ট দলও চাপে পড়ে গেছে।
মিরাজ বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করেছেন, ঘরোয়া ক্রিকেটেও করেছেন—তবে জাতীয় দলে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরম্যাট বাছাই হওয়া উচিত ছিল সঠিকভাবে। পরপর দুটি ভুল সিদ্ধান্ত—বিশ্বকাপে টপঅর্ডারে খেলানো এবং এখন ওয়ানডে অধিনায়ক বানানো—দুটিই বুমেরাং প্রমাণিত হচ্ছে। তাতে মিরাজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা—বাংলাদেশ দল এখন ছন্দহীন। ওয়ানডেতে টানা ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দী দলটি শেষ ১২ ম্যাচের ১১টিতেই হেরেছে। অধিনায়ক মিরাজের অধীনে ১০ ম্যাচে জিতেছে মাত্র একটিতে।
পরিসংখ্যানই বলছে—বোর্ডের সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুধু দলই নয়, মিরাজ নিজেও হচ্ছেন। তাই সময় এসেছে ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশ ক্রিকেটে স্থিতি ফিরিয়ে আনার। আরও গভীরে ডুবে যাওয়ার আগে প্রয়োজন বোধোদয়ের। ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে খুব বেশি সময় যে হাতে নেই।










