রাত গভীর। আলো-আঁধারির শহর বার্সেলোনা নিস্তব্ধতায় ঘেরা। আকাশে হালকা কুয়াশা, ন্যু ক্যাম্প তখন ঘুমিয়ে ছিল। আর ঠিক তখনই, নি:শব্দে ফিরে এলেন তিনি— সেই মানুষ, যাঁর নামের সঙ্গে মিশে আছে এই শহরের প্রতিটি রঙ, প্রতিটি উল্লাস, প্রতিটি কান্না। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি ফিরে গিয়েছিলেন ন্যু ক্যাম্পে— চার বছর পর, একেবারে মাঝরাতে, কাউকে কিছু না জানিয়ে।
দিনের আলোয় তিনি এখন ইন্টার মায়ামির নায়ক। ন্যাশভিলের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে মাত্র একদিন আগেই করেছিলেন দুই গোল, দিয়েছিলেন দুই অ্যাসিস্ট— ৩৮ বছর বয়সেও যেন আগের মতোই তাজা, আগের মতোই দীপ্ত। কিন্তু মাঠের গর্জনের পর সেই নিরব রাত, সেই ফিরে দেখা— সেটাই যেন ছিল তাঁর হৃদয়ের আসল ফুটবল ম্যাচ।
ইনস্টাগ্রামে মেসি লিখেছেন, ‘গতরাতে ফিরে গিয়েছিলাম এমন এক জায়গায়, যেটাকে আমার আত্মা এখনো মিস করে। এমন এক জায়গা, যেখানে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। আশা করি একদিন ফিরব, খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় জানাতে, যেভাবে আগে কখনও পারিনি।’

এই কয়েকটি বাক্যেই যেন ভেসে উঠল কোটি কিউলের নি:শব্দ আকাঙ্খা। ন্যু ক্যাম্পে আবার তাকে দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন গুনগুন করছে বার্সেলোনার প্রতিটি বাতাসে।
ক্লাবের পক্ষ থেকেও আশার আলো জ্বলেছে। বার্সেলোনা সভাপতি হুয়ান লাপোর্তা বলেছেন, ‘আমরা চাই, নতুন স্পোটিফাই ন্যু ক্যাম্পের উদ্বোধন হোক লিওনেল মেসির উপস্থিতিতে। তাঁর জন্যই এই মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি খুব অর্থবহ।’
২০২৩ সাল থেকে চলছে সংস্কারের বিশাল কাজ। স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা বাড়ছে এক লাখ পাঁচ হাজারে, যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আংশিকভাবে ২০২৫ সালের শেষের দিকে খুলে যাওয়ার কথা, তবে মেসির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান হতে পারে ২০২৬-এর পর।

তবে বার্সেলোনার হৃদয়ে মেসি আসলে কোনো বছর বা তারিখে বাঁধা নন। তিনি সেখানে শ্বাস নেন, জীবন্ত কিংবদন্তির মতো। ২০০৪ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে ক্লাবের হয়ে অভিষেক, তারপর দুই দশক জুড়ে ফুটবলকে করেছেন এক অবিস্মরণীয় কবিতা।
৮৩৭ ম্যাচে ৭০৯ গোল— একের পর এক রেকর্ড, আর সঙ্গে ট্রফির ঝলমলে ধারা: ১০টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭টি কোপা দেল রে, ৩টি ক্লাব বিশ্বকাপ, ৩টি উয়েফা সুপার কাপ। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি গোল যেন লিখেছে একই নাম— লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। এক টিস্যু পেপারে চুক্তি সই করে এই মাঠেই পুরো বিশ্বকে নিজের পদতলে নিয়ে এসেছিলেন ক্ষুদে মেসি।
এমন এক মানুষ যখন ফিরে আসেন, তখন শহরটা নি:শব্দে কাঁদে। কোলের মানিক হারিয়ে মায়ের মন যেমন কেঁদে ওঠে। হয়তো তিনি ফিরবেন, হয়তো আর না— কিন্তু তাঁর পায়ের ছাপ এখনো শুকায়নি ন্যু ক্যাম্পের ঘাসে। শহরটা এখনো তাঁর অপেক্ষায়, যেন শিশিরে ভেজা সকালে সূর্যের প্রতীক্ষা।

মেসি বলেছিলেন, ‘আশা করি একদিন ফিরব।’ আর বার্সেলোনা শহর, শহরের সেরা ক্লাব, আর ফুটবল দুনিয়া একসঙ্গে ফিসফিস করে বলে— ফিরে এসো, লিও। বার্সেলোনা তোমার নাম জপেই এখনও নি:শ্বাস নেয়।










