অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনে স্পিন বোলিংয়ের নীরব ইতি

১৮৮৮ সাল থেকে ইতিহাসের পাতায় যেসব দৃশ্য বারংবার ফিরে এসেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে তা যেন আচমকাই বদলে গেলো। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়া নামল কোনো বিশেষজ্ঞ স্পিনার ছাড়াই।

১৮৮৮ সাল থেকে ইতিহাসের পাতায় যেসব দৃশ্য বারংবার ফিরে এসেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে তা যেন আচমকাই বদলে গেলো। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়া নামল কোনো বিশেষজ্ঞ স্পিনার ছাড়াই। যে মাঠ একসময় চতুর্থ ইনিংসে পিচের ফাটল আর ধৈর্যের পরীক্ষার প্রতীক ছিল, সেখানে টড মারফি বসে থাকলেন নিষ্ক্রিয়। আর অস্ট্রেলিয়া আক্রমণ সাজানো হলো কেবল পেস নির্ভর করে।

যা একসময় অবিশ্বাস্য মনে হতো, সেটাই এখন বাস্তবতা। অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে স্পিন এখন আর কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া একটি বিকল্প অস্ত্রমাত্র। ২০২০ সালের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ভেন্যুগুলোতে স্পিনারদের পরিসংখ্যান দেখলেই পরিবর্তনের গভীরতা বোঝা যায়।

সিডনিতে ৪৩ ইনিংসে স্পিনাররা নিয়েছেন ৪৭ উইকেট, গড় ৪৩.৮ ।মেলবোর্নে ২৪ ইনিংসে ৩৬ উইকেট, গড় ৩০.০৮।এবং অ্যাডিলেডে ২৭ ইনিংসে ৩৫ উইকেট, গড় ৩৫.৭৪। অস্ট্রেলিয়ার পিচ কিউরেটররা নিয়মিতভাবে ৮-১০ মিলিমিটার ঘাস রেখে পিচ বানাচ্ছেন। যার লক্ষ্য স্পষ্টতই দ্রুত ফল, ড্র এড়ানো, আর ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পূর্ণ পয়েন্ট। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ খেলা থেকে স্পিনটা যেন প্রায় মুছেই যাচ্ছে।

চলতি অ্যাশেজ সিরিজে দুই দলের স্পিনাররা মিলিয়ে বল করেছেন মাত্র ১৩০ ওভারের একটু বেশি। অস্ট্রেলিয়ায় তিন বা তার বেশি টেস্টের কোনো সিরিজে এত কম স্পিন বোলিং আগে কখনো হয়নি।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, স্পিনারদের নেওয়া নয়টি উইকেটের মধ্যে আটটিই এসেছে কেবল অ্যাডিলেড টেস্টে। ওই একটি ম্যাচ বাদ দিলে পুরো সিরিজজুড়ে স্পিন কার্যত অনুপস্থিত।

২০২০ সালের পর অস্ট্রেলিয়ায় স্পিনাররা ১৩৬ ইনিংসে ১৬৭ উইকেট নিয়েছেন, গড় প্রায় ৩৮। অপরদিকে, পেসাররা ৪৩০ ইনিংসে নিয়েছেন। ৭৭১ উইকেট, গড় ২৫.৯৬।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ম্যাচের দৈর্ঘ্যে। টেস্ট ক্রিকেট, যা পাঁচ দিনের ধৈর্যের লড়াই হওয়ার কথা, সেখানে ম্যাচ শেষ হচ্ছে দুই কিংবা তিন দিনে।এই একমুখী সিম আধিপত্য খেলাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। ব্যাটসম্যানরা সময় পাচ্ছে না, স্পিনাররা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না, আর কৌশলগত স্তর তৈরি হওয়ার আগেই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে।

এই অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার সাফল্য বিষয়টিকে আপাতত ঢেকে রেখেছে। জয় অনেক প্রশ্নকেই চুপ করিয়ে দেয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের সুস্থতা নির্ভর করে বৈচিত্র্যের ওপর।

যাই হোক, অ্যাশেজের এই পঞ্চম টেস্ট যেন একটি সীমারেখা।যখন স্পিনের ঐতিহ্যে গড়া একটি মাঠ এখন স্পিন ছাড়াই চলে, তখন বোঝা যায়, বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। আর সেই পরিবর্তন মোটেই সুখকর নয়।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link