২০১৫ সালে রুটি-রুজির টানে দুবাই পাড়ি দিয়েছিলেন উসমান তারিক। বয়স তখন খুব বেশি নয়, কিন্তু দায়িত্ব পাহাড়সম। চার বছরও হয়নি, এমন বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ তিনি। তাই ক্রিকেট—যেটা ছিল স্বপ্ন, নেশা, ভালোবাসা—তা একরকম গুটিয়েই রাখতে হয়েছিল।
নওশেরার লম্বা-চওড়া ছেলেটা একসময় পেসার ছিলেন, স্পিনও করতেন। কিন্তু দুবাইয়ে গিয়ে ব্যাট-বল নয়, হাতে তুলে নিতে হয়েছিল চাকরির কাগজপত্র। টুকটাক কয়েকটা কাজ বদলে শেষে একটা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে পারচেজ কো-অর্ডিনেটরের স্থায়ী চাকরি জোটে। জীবন তখন নিয়মিত, কিন্তু রঙহীন।
তারপর এক সন্ধ্যায় সব বদলে গেল। ২০১৬ সালের শেষ দিকে তিনি দেখলেন ‘এমএস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’। ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবন নিয়ে বানানো সেই সিনেমা যেন তারিকের বুকের ভেতর চাপা পড়ে থাকা আগুন আবার জ্বালিয়ে দিল।
ধোনি রেলওয়েতে টিকিট চেকারের চাকরি করতেন, তারপর সব ছেড়ে ক্রিকেটে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন—এই জায়গাটাই সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তারিককে। বলছিলেন, ‘আমি চাকরি করছিলাম, সেও করছিল। সে ইতিহাস গড়েছে। আমি সাধারণ মানুষ, আমিও কি পারি না?’

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আবার মাঠে ফেরা। ভোরের আলো ফোটার আগে অনুশীলন, অফিস শেষে আবার জিম আর নেট। শরীর ছিল, উচ্চতা ছিল প্রায় ৬ ফুট ১ ইঞ্চি—এবার দরকার ছিল বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের নাম—ধোনি।
কয়েক বছরে বদলে গেল গল্পের গতি। সিপিএল, পিএসএল, আইএলটি-টোয়েন্টির মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে অডিশন, সুযোগ, পরিশ্রম—সব মিলিয়ে নিজের নামটা ধীরে ধীরে তুলে আনলেন আলোয়। অবশেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তানের জার্সি গায়ে তোলেন। বিশ্বকাপে অভিষেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তিন উইকেট—স্বপ্ন তখন আর দূরের নয়।
কিন্তু আসল আলোটা পড়ল অন্য জায়গায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে শুরু হলো আলোচনা। থামা, ভ্যারিয়েশন, ডেলিভারির ছন্দ—সব নিয়ে কথা। ভারত ম্যাচের আগে তো সাবেক ক্রিকেটার, মিডিয়া, ভক্ত—সবাই যেন তার অ্যাকশন বিশ্লেষণে নেমে পড়লেন।
এমনকি ভারতীয় ব্যাটাররাও অনুশীলনে তার অ্যাকশন নকল করার চেষ্টা করেছেন। এই চাপে অনেকেই ভেঙে পড়েন। তারিক ভাঙেননি। বরং বললেন, ‘ওরা যদি আমার জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেয়, তাহলে বুঝতে হবে আমি কিছু একটা করছি।’

কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। গ্যালারির ৯০ শতাংশ সমর্থন ভারতের পক্ষে। তবু তারিকের মুখে ছিল অদ্ভুত শান্তি। যেখানে শাহিন আফ্রিদি, শাদাব খান, আবরার আহমেদদের ওপর চাপ বাড়ছিল, সেখানে তারিক চেষ্টা করেছেন খেলা ধরে রাখতে।
চার ওভারে ২৫ রান, এক উইকেট। শেষের আগের ওভারে ফিরিয়েছেন সূরিয়াকুমার যাদবকে। বড় বাউন্ডারি টপকাতে পারেননি ভারত অধিনায়ক। উইকেট নিয়ে তারিকের উদ্যাপনেও ছিল আলাদা ছাপ—উচ্ছ্বাস, কিন্তু ভদ্রতা মেশানো। পরের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ক্যারিার সেরা বোলিং ফিগার, উসমান তারিক এখন রীতিমত আকাশে উড়ছেন।
দুবাইয়ের অফিসঘরের টেবিল থেকে কলম্বোর আলোকমন্ডিত স্টেডিয়াম—এই পথটা সোজা ছিল না। মাত্র ছয় ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, তবে ক্রিকেটের উত্তাপ চিনে গেছে তাঁর নাম। একসময় যে ছেলে চাকরি বাঁচাতে ক্রিকেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, সে-ই আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বল করছে, নায়ক বনে যাচ্ছে।
ধোনির গল্প তারিককে ফিরিয়ে এনেছিল মাঠে। কে জানে, এখন তারিক নিজেই হয়তো অন্ধকার ঘরে বসে থাকা কোনো স্বপ্নবাজ মানুষের জন্য নতুন গল্প হয়ে উঠছেন।











