অফস্পিনের সামনেই ভড়কে যায় ভারত!

কখনও কখনও সবচেয়ে সহজ পরিকল্পনাটাই সবচেয়ে কার্যকর। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের টপ অর্ডার দেখলেই সেটা বোঝা যায়। প্রথম পছন্দের শীর্ষ আট ব্যাটারের মধ্যে ছয়জনই বাঁহাতি। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য সমীকরণটা খুব জটিল নয়—অফস্পিন বাড়াও, চাপ বাড়াও।

আর দলগুলো ঠিক সেটাই করেছে। দারুণ সাফল্যও পেয়েছে। গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে অফস্পিন হয়েছে ১০২ বল—এই টুর্নামেন্টে যা সর্বোচ্চ। রান রেট মাত্র ৬.২৩। যে দলগুলো অন্তত ছয় ওভার অফস্পিন খেলেছে, তাদের মধ্যে কেবল নেপাল আর ওমানের রান রেট ভারতের চেয়ে কম। উইকেটও পড়েছে নিয়মিত; গড় ১৩.২৫। সংখ্যাগুলো ছোট স্যাম্পলের, তবু বার্তাটা পরিষ্কার—ভারতের বাঁহাতিরা অফস্পিনে স্বচ্ছন্দ নয়।

তবে গল্পটা শুধু সংখ্যার নয়, মানেরও। গেরহার্ড ইরাসমাসের রিলিজ পয়েন্টের ধোঁকা, সাইম আইয়ুব আর উসমান তারিকের ভিন্নতা, আর আরিয়ান দত্তের গতি ও নিখুঁত লাইন—সব মিলিয়ে ভারতের সামনে সহজ পরীক্ষা ছিল না। কলিন অ্যাকারম্যান প্রায় একই গতিতে বল করেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনটি ছক্কা হজম করেছেন; এখানেই বোঝা যায়, গুণগত পার্থক্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

পিচও ভূমিকা রেখেছে। ধীর, গ্রিপি কলম্বো থেকে স্কিডি আহমেদাবাদে এসে বলের আচরণ বদলে গেছে। যে আন্ডারকাট ডেলিভারি কলম্বোতে হয়তো থেমে যেত, আহমেদাবাদে সেটাই ব্যাটে দ্রুত এসে ধাক্কা দিচ্ছে। মানিয়ে নেওয়ার সময় সব দলেরই লাগে, ভারতেরও লেগেছে।

এর মধ্যে অভিষেক শর্মার শুরুটা যেন নাটকীয়—টানা তিনটি ডাক। দু’বার আউট আক্রমণাত্মক শটে, অফস্পিনের বিপক্ষে। এমন দিন ক্রিকেটে আসে, যুক্তি দিয়ে সব বোঝানো যায় না।

কিন্তু সুপার এইটে ভারতের প্রতিপক্ষরা নিশ্চয়ই নোট নিয়েছে। নেটে নতুন বলে অফস্পিন করানো হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এইডেন মার্করাম আছেন, জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা নতুন বলেও আসতে পারেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ রোস্টন চেজকে পাওয়ারপ্লেতে ব্যবহার করতে পারে। পরিকল্পনা স্পষ্ট—ভারতের বাঁহাতি শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো।

ভারতও জানে কী আসছে। তাই প্রশ্ন উঠছে তিন ও চার নম্বর নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে তিলক ভার্মা তিনে, সুরিয়াকুমার যাদব চারে—এই ফর্মুলা বেশ স্থির। সঙ্গে ঈশান কিষাণ ওপেনিংয়ে থাকায় টপ থ্রি পুরোটাই বাঁহাতি। তিলক এ বিশ্বকাপে অফস্পিনে ৩১ বল খেলে করেছেন ২৬ রান। সুরিয়াও খুব স্বচ্ছন্দ নন—২৮ বলে ২৮। সংখ্যায় দু’জনের পার্থক্য নেই।

তবু ক্রিকেট কেবল অঙ্ক নয়। প্রথম ১০ ওভারে পেসের বিপক্ষে তিলক ঝরো শুরু দিতে পেরেছেন—৪১ বলে ৬২ করেছেন। সুরিয়া শুরুতে খানিক ধীর গতিতে খেলেন — ২৬ বলে ২৯ রনে করেছেন। কিন্তু, ইনিংসের শেষভাগে সুরিযা যেন অন্য মানুষ; পেসের বিপক্ষে স্ট্রাইক রেট ১৫০ ছাড়িয়ে যায়। হয়তো দল মনে করে, তিলক শুরুতে ঝুঁকি নেবেন, সূর্য সময় নিয়ে সেট হয়ে পরে ঝড় তুলবেন। এই ভূমিকা ভাগই তাদের কাঠামোর অংশ।

অফস্পিনে আটকে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভারতও নিশ্চয়ই নেটে কাজ করছে। কিন্তু, এখনই টেমপ্লেট ভাঙার মতো সংকট কি তৈরি হয়েছে? আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে খাঁটি অফস্পিন এখন বিরল প্রজাতি। বেশিরভাগই পার্ট-টাইমার বা ব্যাটিং অলরাউন্ডার।

এই একটা জায়গাতেই ভারতের ‘আশা’ আছে। তবে, যদি সুপার এইটে অফস্পিন আবার ভারতের পথ আটকে দেয়, তবে তাদেরও নতুন চিন্তা বের করতে হবে।  সবচেয়ে সহজ পরিকল্পনাই কখনও কখনও সবচেয়ে কার্যকর হয়। এখন দেখার বিষয়, সেই সরল সমীকরণ ভাঙার জন্য ভারতের হাতে কী নতুন উত্তর আছে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link