মেডেলিনের আকাশ যখন বিষণ্ণতায় নুইয়ে পড়ে, তখন মনে হয় প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা আজও আন্দ্রেস এস্কোবারের সেই অকাল বিদায়ের কথা বলে। ফুটবল যাঁদের কাছে কেবল বাইশ জন মানুষের লড়াই নয়, বরং অস্তিত্বের ব্যাকরণ, তাঁদের কাছে আন্দ্রেস এস্কোবার একটি অসমাপ্ত কবিতার নাম। তিনি ছিলেন কলম্বিয়ার ডিফেন্সের সেই অতন্দ্র রাজপুত্র, যার পায়ের ছোঁয়ায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে বিদীর্ণ এক জাতি খুঁজে পেত শান্তির একচিলতে অনুবাদ।
আন্দ্রেসের জন্ম এমন এক সময়ে যখন কলম্বিয়া ফুটবল আর অপরাধ জগতের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। লম্বা গড়ন আর আত্মবিশ্বাসী পদচারণায় তিনি যখন আতলেতিকো নাসিওনালের রক্ষণ সামলাতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন কোনো গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক। ১৯৯০ এর দশকে কলম্বিয়ার সেই সোনালী প্রজন্মের তিনি ছিলেন অন্যতম স্থপতি। ডিফেন্সের অতন্দ্র প্রহরী হয়েও তাঁর মুখে থাকতো শান্ত এক হাসি, যা মেডেলিনের রক্তাক্ত রাজপথের বিভীষিকাকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে দিত।
তবে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রও যে কখনো কখনো পথ হারায়।১৯৯৪ সালের ২২ জুন। ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে তখন উত্তাপের পারদ তুঙ্গে। কলম্বিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাচের ৩৪তম মিনিট। সময়ের কাঁটা যেন হঠাৎই থমকে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের জন হার্কসের একটি ক্রস আটকাতে গিয়ে স্লাইড করলেন আন্দ্রেস। কিন্তু বলটি তাঁর বুটের আলতো ছোঁয়ায় দিক বদলে জড়িয়ে গেল কলম্বিয়ার নিজেরই জালে।

পুরো স্টেডিয়াম তখন নিস্তব্ধ। আন্দ্রেস মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড। সেই মুহূর্তে তাঁর মুখাবয়বে যে বিষণ্নতা ছিল, তা যেন ছিল এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। একটি গোল কেবল একটি পয়েন্ট হারানো নয়, সেটি ছিল এক জাতির অলিখিত স্বপ্নভঙ্গ।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে কলম্বিয়ায় ফিরে আন্দ্রেসকে অনেকেই বারণ করেছিলেন বাইরে বেরোতে। তবে দেশপ্রেমিক আন্দ্রেস পালিয়ে থাকতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সামনে দাঁড়ানোই হলো বীরত্বের পরিচয়। তিনি তো কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন, কোনো অপরাধী নন। তাঁর শহরের মানুষ তাঁকে অন্তত একটি সুযোগ অবশ্যই দেবে। নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার, আবারও সেই সবুজ গালিচায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর।
কিন্তু ঠিক দশদিন পরেই আসে সেই কালরাত। একটি নৈশক্লাবের পার্কিং লটে তাঁকে ঘিরে ধরে দুর্বৃত্তরা। একে একে ছয়টি বুলেটে তাঁর শরীর বিদ্ধ করে দেয়। বুলেটগুলো যখন তাঁর দেহ ভেদ করছিল, প্রতিটি গুলির সাথে আততায়ীরা চিৎকার করে উঠছিল ‘গোল’..!!। ফুটবল মাঠের যে শব্দটি একসময় আন্দ্রেসের কানে মধুর সংগীতের মতো বাজত, সেই শব্দটাই তাঁর শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গী হলো।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে নিভিয়ে দেওয়া হলো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি রচিত হলো মাঠের বাইরে, পিচঢালা কালো রাস্তায়। ঘাসের ওপর যে বীরত্ব তিনি দেখিয়েছিলেন, তার সমাপ্তি ঘটল রক্তের এক লোনা নদীতে।
আন্দ্রেসের শেষ বিদায়ে মেডেলিনের রাজপথে নেমেছিল এক লক্ষাধিক মানুষের ঢল। তারা কোনো ফুটবলারকে বিদায় দিতে আসেনি, এসেছিল তাদের হারানো নৈতিকতাকে দাফন করতে। শেষবারের মতো বিদায় জানাতে সেই রাজপুত্রকে, যার মুকুট কেড়ে নেওয়া হয়েছিল কেবল মাঠের এক ভুলের জন্য। কিন্তু যার সিংহাসন আজও কোটি ভক্তের হৃদয়ে অটুট।










