ক্রিকেট মাঠে মহাকাব্য সবসময় চার-ছক্কার আস্ফালনে লেখা হয় না। কিছু উপাখ্যান রচিত হয় ধীরস্থির মস্তিস্কে, খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার অদম্য জেদে। বাংলাদেশ ক্রিকেটে সেই শান্ত অথচ বিধ্বংসী গল্পের নাম মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। যখনই বৈশ্বিক মঞ্চের আলো জ্বলে উঠেছে এবং দলের বাকিরা চাপে নুইয়ে পড়েছেন, তখনই রিয়াদ হয়ে উঠেছেন আমাদের ত্রাতা, আওয়ার ভেরি ওন ‘সাইলেন্ট কিলার’।
আইসিসি ইভেন্টে রিয়াদের কথা উঠলে ২০১৫ বিশ্বকাপের কথা আসবেই। অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে সেই ইনিংসটি কেবল একটি শতক ছিল না, সেটি ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক বিশাল দেয়াল ভেঙে ফেলার দিন। প্রথম কোনো বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে তিন অঙ্কের দেখা পান রিয়াদ।
সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও টানা শতক হাঁকান তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম বিশ্বকাপ যাত্রায় ব্যাট হাতে সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধার পরিচয় দিয়েছেন রিয়াদই। ২০১৫ বিশ্বকাপে মোটে ছয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৭৩ গড়ে ৩৬৫ রান করেন তিনি। ক্রিকেটের কুলীন দেশগুলোর বিপক্ষে বড় মঞ্চে তার সেই নির্ভীক ব্যাটিং আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে আছে।

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেই ম্যাচটি কি ভোলা সম্ভব? নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৩৩ রানে চার উইকেট হারিয়ে যখন ধুঁকছে বাংলাদেশ, তখন ক্রিজে এলেন রিয়াদ। সেই ভগ্নস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে সাকিব আল হাসানকে সাথে নিয়ে যেন কার্ডিফের আঙিনায় এক রূপকথার রচনা করলেন তিনি। আরও একটিবার রিয়াদের ব্যাটে ভর করেই বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো কোনো আইসিসি ইভেন্টে নিশ্চিত করেছিল সেমিফাইনাল।
রিয়াদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার হার না মানা মানসিকতা। ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যখন চারদিকে সমালোচনা, তখনো তিনি ছিলেন মিডল অর্ডারের অন্যতম ভরসা। এমনকি ২০২৩ বিশ্বকাপে দল যখন গভীর সংকটে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার সেই লড়াকু শতকটিই সম্মান রক্ষা করেছিল বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের অন্যান্য ব্যাটাররা যেখানে বিশ্বমঞ্চে খেলতে নামলেই যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেন, সেখানে রিয়াদ ছিলেন এক সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রমী চরিত্র। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ২২ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৫২.৪৪ গড়ে ৯৪৪ রান করেছেন তিনি। হাঁকিয়েছেন সর্বোচ্চ তিনটি শতক। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও রিয়াদের রেকর্ড উজ্জ্বলতম। পাঁচ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৪৭ গড়ে সংগ্রহ করেছেন ১৪১ রান।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই মায়াবী নক্ষত্র যখন ইতোমধ্যেই তার ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন, তখন পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় এক নিঃসঙ্গ নাবিকের ছবি। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ যখন বারবার নৌকাটিকে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছে, রিয়াদ তখন হাল ধরেছেন শক্ত হাতে, কোনো উচ্চবাচ্য ছাড়াই।










