দার্শনিকদের দৃষ্টিতে কোনো মানুষের জীবনই নিষ্কণ্টক হয় না। অপরিসীম সংগ্রাম আর দৃঢ় সংযমের প্রেরণাকে সঙ্গী বানিয়েই ছুঁতে হয় জীবনের সোনালী সাফল্যগুলো। এমন দর্শনকেই নিজের জীবনে প্রয়োগ করে অনেকে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন, লিখেছেন সংগ্রাম আর সংযমের অম্লান সব গল্প! ক্রিকেটেও তেমনই একটা চরিত্র আছে, শিবনারায়ণ চন্দরপল!
লাতিন আমেরিকার ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র গায়ানায় এক দরিদ্র জেলে পরিবারে ১৯৭৪ সালে জন্ম চন্দরপলের। বাবা খেমরাজ চন্দরপলও অপেশাদারভাবে ক্রিকেট খেলতেন স্থানীয় এক ক্লাবে। কিন্তু সেখানকার ব্যাটাররা রান করায় নিয়মিত ছিলেন না। ক্ষুব্ধ খেমরাজ তাই সিদ্ধান্ত নেন, নিজের ছেলেকেই ক্রিকেটার বানাবেন তিনি! কিন্তু ব্যাট, বল, উইকেট, প্যাড বা হেলমেট কেনার সামর্থ্য কোথায় তাঁর?
তবে স্বপ্ন দেখা ছাড়লেন না তিনি! আটলান্টিক মহাসাগরের গায়ানা উপকূলের দীর্ঘকায় নারকেল গাছের গুঁড়ি থেকেই শিবনারায়ণের জন্য ব্যাট-বল, প্যাডের মতো জিনিসের ব্যবস্থা করেন খেমরাজ। আর এভাবেই সূচনা ঘটে চন্দরপলের ক্রিকেটীয় সংগ্রামের!

চন্দরপল সবচেয়ে আলাদা হয়ে ওঠেন তাঁর সংযমী খেলার ধরনের কারণে। বিশেষত টেস্ট ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে সারাদিন পিচের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার প্রবণতা তাঁকে অনন্য পরিচিতি এনে দেয়।
কিংবদন্তি রান দানব ব্রায়ান লারার মতো দীর্ঘ সব ইনিংস খেলা কিংবা ক্রিস্টোফার হেনরি গেইলের মতো পেশিশক্তির প্রদর্শনের দিকে কোনো ঝোঁক ছিল না এই বাঁহাতি ব্যাটারের। তাঁর ছিল স্রেফ হিমালয়সম ধৈর্য আর ইস্পাতদৃঢ় মনোঃসংযোগ। চোখের নিচে কালো স্টিকার পরে ক্রিজে অদ্ভুতুড়ে ব্যাটিং স্ট্যান্স নিয়ে তিনি যখন ব্যাট হাতে নিতেন, তখন যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে যেত আর অলিম্পাসের দেবতার আশীর্বাদ ঝরে পড়ত অকাতরে!
যার বদৌলতে টেস্ট ইতিহাসে সতীর্থদের সাথে রেকর্ড ৭৫০টি জুটি গড়ার অনন্য নজির গড়েছেন তিনি! দেখেছেন ক্রিজের অপর প্রান্ত থেকে সতীর্থদের পাঁচ শতাধিক বার বিদায় হওয়ার দৃশ্যও! তবু লোয়ার-মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে নেমে একপ্রকার ঠাণ্ডা মাথার স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত হতেন চন্দরপল! আর তাঁর সময়োপযোগী কার্যকর সব ইনিংসের জোরে জয়ের বন্দরে নোঙর করত ওয়েস্ট ইন্ডিজ!

২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে ক্যারিবীয়দের জয়ের অবিস্মরণীয় ম্যাচটার দিকে ফিরে তাকালেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়! জ্যামাইকাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪১৮ রানের টার্গেট দেয় অজিরা। সেসময়ে এতবড় রান পাহাড় পেরিয়ে কোনো দল জয়ের দেখা পায়নি৷ সঙ্গে কয়েকজন অভিজ্ঞ টপ অর্ডার ব্যাটারের ভুলের কারণে ক্যারিবীয়রা চাপে পড়ে আরও। আর এসময়েই দৃশ্যপট হাজির হন চন্দরপল। নির্মোহ ভঙ্গিতে ব্যাটিং করে ১০৩ রানের এক ক্যামিও ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে নির্লিপ্তভাবে মাঠ ছাড়েন তিনি। অথচ, ব্যক্তিগত ৮৬ রানে অজি পেসার ব্রেট লির বুলেট গতির ডেলিভারির আঘাতে মাথায় চোট পেয়ে খানিকক্ষণ মাটিতে ধরাশয়ী ছিলেন তিনি। এরপরও তিনি আত্মবিশ্বাস আর সংযমকে পুঁজি করে দাঁড়িয়েছেন, খেলেছেন এবং রেকর্ড পরিমাণ রান তাড়া করে দেশকে জেতানোর কীর্তি গড়েছেন!
ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের জৌলুস যে সময়ে ক্রমাগত ফিকে হচ্ছিল, সেসময়েও নির্লিপ্ত থেকে দলকে এগিয়ে নিতে অধ্যবসায়ী হয়েছিলেন চন্দরপল। তাই লোয়ার-মিডল অর্ডার ব্যাটার হয়েও তাঁর নামের পাশে ১১ হাজারের ওপরে রান, ওয়ানডেতেও সংখ্যাটা ৮ হাজার ৭৭৮।
এরপরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এই কিংবদন্তির বিদায়টা সুখকর হয়নি। ক্যারিবীয় ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ তাঁকে ন্যূনতম সম্মান জানানোরও প্রয়োজন মনে করেনি। তবু তা নিয়ে কোনো আক্ষেপ পুষে রাখেননি চির সংযমী চন্দরপল। বরং ছেলে তেজনারায়ণ চন্দরপলকেও নিজের মতো ক্রিকেটের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। আর এভাবেই তাঁর মানসিকতা হয়ে উঠেছে সংগ্রাম আর সংযমের এক অদ্ভুত সৌরভ!











