বাংলাদেশি ব্যাটিংয়ের নেপথ্য গেমচেঞ্জার

তিনি শুধু ব্যাটারদের টেকনিক ঠিক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং খেলোয়াড়দের মানসিকতায় এনেছেন বিরাট পরিবর্তন।

জাতীয় দলে ব্যাটার হিসেবে তাঁর ব্যাটিং মেধা ও ক্লাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাধ্য ছিল না কারও। তবে ক্রিকেটীয় জীবনের আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় অধ্যায়ে মোহাম্মদ আশরাফুল নিজেকে তুলে ধরেছেন একদম নতুন পরিচয়ে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন দক্ষ, নীরব ও দূরদর্শী ব্যাটিং কোচ হিসেবে।

​বাংলাদেশ জাতীয় দলে মোহাম্মদ আশরাফুল ব্যাটিং কোচ হিসেবে সবচেয়ে বড় অবদান হলো – তিনি শুধু ব্যাটারদের টেকনিক ঠিক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং খেলোয়াড়দের মানসিকতায় এনেছেন বিরাট পরিবর্তন।

জাতীয় দলে দীর্ঘকাল খেলা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানসিক চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ডোপ টেস্ট থেকে শুরু করে ফর্মের উত্থান-পতন, ক্রিকেটের নানা ঘাত-প্রতিঘাত কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।

আর এই অভিজ্ঞতাই তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন জাতীয় দলের তরুণ ও অভিজ্ঞ ব্যাটারদের মাঝে। কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে ধৈর্য ধরে ইনিংস বড় করতে হয়, চাপের মুখে রান তোলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় – সে বিষয়ে ব্যাটারদের মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিংয়ে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন।

তরুণ ব্যাটাররা যখন জাতীয় দলে জায়গা পাকা করার লড়াইয়ে ছিলেন, তখন টেকনিক্যাল ড্রিল ও টেম্পারমেন্ট তৈরিতে আশরাফুল কাজ করেছেন নিবিড়ভাবে। অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছাড়া কিংবা পেস-স্পিনের বিপক্ষে পায়ের ফুটওয়ার্ক নিখুঁত করার ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ ব্যাটারদের ধারাবাহিকতা এনে দিয়েছে।

আশরাফুলের কোচিংয়ের টেকনিক্যাল কার্যকারিতা সবচেয়ে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম ম্যাচে। এই ম্যাচে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটাররা হার্ড হ্যান্ডসে খেলতে গিয়ে বারবার ব্যাটের কানায় লেগে ইনসাইড এডজ হয়ে স্টাম্পড ও বোল্ড হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটাররা স্যুইং ও ভ্যারিয়েশনে ড্রাইভ করতে গিয়ে অফ স্টাম্প আর ব্যাটের মাঝে গ্যাপ তৈরি করায় উইকেট হারিয়েছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশি ব্যাটারদের ছিল একদম বিপরীত দৃশ্য। তারা অসাধারণ লিভ করার দক্ষতা দেখিয়েছেন। অফ স্টাম্পের বাইরের বিপজ্জনক গুড লেংথ ও শর্ট অব লেংথ বলগুলো নিখুঁতভাবে রিড করে ছেড়ে দিয়েছেন।

অহেতুক কভার ড্রাইভ বা কাট শট খেলতে না গিয়ে ব্যাটের ফেস শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, যা তাদের এডজ হয়ে ক্যাচ বা বোল্ড হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। আশরাফুলের শেখানো এই ডিসিপ্লিন ও শট সিলেকশনের কারণেই অজি পেসার ও স্পিন আক্রমণের সামনে বাংলাদেশি ব্যাটাররা এমন ধৈর্যশীল ব্যাটিং দেখাতে পেরেছেন।

জাতীয় দলের যেকোনো ব্যাটার ফর্মে না থাকলে বা টেকনিক্যাল সমস্যায় পড়লে প্র্যাকটিস সেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও অ্যানালিসিস নিয়ে বসেন আশরাফুল। ব্যাকফুট মুভমেন্ট, হেড পজিশন কিংবা ব্যাটের ফেস খোলার সময়ের মতো ছোট ছোট সূক্ষ্ম ভুলগুলো তিনি ধরিয়ে দেন বন্ধুসুলভ ও সহজ উপায়ে, যা ব্যাটাররা সহজে গ্রহণ করতে পারেন।

​ড্রেসিংরুমে একজন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে এক দুর্দান্ত বোঝাপড়া। হেড কোচের কৌশল এবং খেলোয়াড়দের বাস্তব প্রয়োগের মাঝে সেতুবন্ধন হয়ে কাজ করছেন তিনি। গ্যালারির তালি হয়তো প্রধানত খেলোয়াড়দের জন্যই বরাদ্দ থাকে, কিন্তু লাল-সবুজের ব্যাটিং লাইনআপে স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাস ফেরানোর লড়াইয়ে আশরাফুল ইসলাম নামের কারিগরটি নিজের কাজটুকু করে যাচ্ছেন আড়ালেই – নীরবে ও নিখুঁতভাবে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link